
রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলে শিক্ষা সব সময়ই একটি কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। একটি জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত হলো একটি আধুনিক ও কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা। উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষা আজ আর কেবল একটি সামাজিক খাত নয়; এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।
বৈশ্বিক উন্নয়ন কাঠামোতেও শিক্ষার এই গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪–এর মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং আজীবন শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা। জাতীয় শিক্ষা নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ এর আওতায় নির্ধারিত টার্গেটসমূহ শিক্ষা উন্নয়নের একটি সুস্পষ্ট বৈশ্বিক রূপরেখা প্রদান করে। এর প্রথম টার্গেট (৪.১) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সকল শিশু ও কিশোর-কিশোরীর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে টার্গেট ৪.২–এ মানসম্মত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যাতে শিশুর প্রাথমিক বিকাশ সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে টার্গেট ৪.৩ উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলে, যাতে তরুণরা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আধুনিক বিশ্বে দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে টার্গেট ৪.৪–এ যুবসমাজ ও প্রাপ্তবয়স্কদের প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে টার্গেট ৪.৫ শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। এর পাশাপাশি টার্গেট ৪.৬ প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতা ও মৌলিক গণিত দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। টার্গেট ৪.৭ আবার শিক্ষার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার, লিঙ্গসমতা এবং বৈশ্বিক নাগরিকত্ব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
এসডিজি-৪ কেবল শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেয়। টার্গেট ৪.এ অনুযায়ী নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিক্ষাবান্ধব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশকে উন্নত করে। একইসঙ্গে টার্গেট ৪.বি উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলে। আর টার্গেট ৪.সি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়, কারণ শিক্ষকই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ অর্জনে নব-নির্বাচিত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ভাবনায় একটি সমন্বিত ও সময়োপযোগী রূপান্তরের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক মূল্যবোধ বিকাশের একটি কৌশলগত মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জীবনমুখী শিক্ষা। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা শুধু তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ অর্জন করতে পারে। আধুনিক বিশ্বে পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় এই ধরনের দক্ষতা শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার শক্ত ভিত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ শিশুর বৌদ্ধিক, সামাজিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি নির্মিত হয় এই স্তরেই। সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট শক্তিশালী করার পরিকল্পনা শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতিকে আরও কার্যকর করতে পারে।
মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, উন্নত পাঠ্যক্রম এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয় শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে শিশুদের শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এবং বিদ্যালয়কে একটি আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশে পরিণত করাও এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষাখাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাসামগ্রী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য এই বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারও এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকদের ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং শিক্ষামূলক ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের উদ্যোগ শিক্ষাকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবমুখী করে তুলতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রাপ্তি ও গবেষণার সুযোগ বাড়াবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাস এবং স্বশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে এটি সহায়ক হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা আজকের জ্ঞানভিত্তিক সমাজে একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে।
ডিজিটাল এডু-আইডি প্রবর্তনের পরিকল্পনা শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক তথ্যভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, ঝরে পড়া প্রতিরোধ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এতে সৃষ্টি হতে পারে। শিক্ষাকে আনন্দময় ও মানবিক করে তোলার ধারণাও এই শিক্ষা ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” ধারণার মাধ্যমে দলগত কাজ, সহমর্মিতা, নেতৃত্বগুণ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকাশের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে এবং জ্ঞানকে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার দক্ষতা অর্জন করবে। দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ শিক্ষা ভাবনার একটি কৌশলগত দিক। মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সমাপ্তির আগেই কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পাবে।
তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রবর্তনের পরিকল্পনাও শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। বিশ্বায়নের যুগে ভাষাগত দক্ষতা জ্ঞান ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, উপযোগী শিক্ষাসামগ্রী এবং সহায়ক অবকাঠামো নিশ্চিত করা শিক্ষা সমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলে শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ শিক্ষাকে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে। শিক্ষা তখনই কার্যকর হয় যখন তা সকলের জন্য সমানভাবে প্রাপ্য হয়।
স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করাও শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয় পরিবেশ, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এবং প্রান্তিক অঞ্চলে ‘মিড-ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শেখার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। শিক্ষকদের মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়নকে এই শিক্ষা ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক স্বীকৃতি বৃদ্ধি শিক্ষকতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত যৌথ গবেষণাগার, উদ্ভাবন তহবিল এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন উদ্যোগ শিক্ষাকে উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের শিক্ষা ভাবনায় একটি সমন্বিত রূপান্তর কৌশল প্রতিফলিত হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষাকে সমান্তরালভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা যখন জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও উদ্ভাবনের সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হয়, তখনই মানবসম্পদ উন্নয়ন হয় কার্যকর ও টেকসই। জাতীয় শিক্ষা উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর এই সমন্বিত প্রয়াস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস্/আইইউ