মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা: প্রবাসী অর্থের ওপর নতুন চাপ

রাহমান তৈয়ব

মতামত

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা—বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের সম্ভাব্য সংঘাত—শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি দক্ষিণ

2026-03-10T15:41:15+06:00
2026-03-10T15:41:15+06:00
শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা: প্রবাসী অর্থের ওপর নতুন চাপ
রাহমান তৈয়ব
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ৩:৪১ পিএম   (ভিজিট : ২২৮)
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা—বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের সম্ভাব্য সংঘাত—শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যার অর্থনীতির একটি বড় ভরকেন্দ্র প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স, সেই প্রভাবের বাইরে থাকার সুযোগ নেই। যদি যুদ্ধ বিস্তৃত আকার ধারণ করে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির জীবন, কর্মসংস্থান এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ একসঙ্গে সংকটে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনে কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশি কর্মরত। তারা নির্মাণ, সেবা, তেল–গ্যাস, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এবং গৃহকর্মসহ নানা খাতে কাজ করেন। দেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশও এই অঞ্চল থেকে আসে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সরাসরি না হলেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

ইরান–ইসরাইল উত্তেজনা নতুন ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, সিরিয়া ও লেবাননে প্রক্সি সংঘাত, এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীল। যদি উত্তেজনা সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার অভিঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমগ্র উপসাগরীয় অর্থনীতিতে ঢেউ লাগবে।

এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বৃহত্তর সমুদ্রে যাওয়ার প্রধান পথ এই সরু প্রণালী, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। যদি যুদ্ধের কারণে প্রণালীতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, জ্বালানির দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে চাপ পড়বে। এর প্রভাব প্রথমে পড়বে প্রবাসী শ্রমবাজারে।

অতীতে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক মন্দা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিদেশি শ্রমিকরা প্রথমে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। নির্মাণ প্রকল্প স্থগিত হওয়া, নতুন প্রকল্প কমে যাওয়া, বা ব্যবসায়িক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত—এসব ক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমিকদের ওপরই প্রভাব বেশি পড়ে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যদক্ষতার কাজ করেন, তাই অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।

রেমিট্যান্স প্রবাহও প্রভাবিত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স শুধু পারিবারিক আয়ের উৎস নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হলে রেমিট্যান্সে ধাক্কা লাগতে পারে—যার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

মানবিক দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বসবাস ও চলাচল নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়। প্রবাসীরা সাধারণত স্থানীয় সমাজের প্রান্তিক স্তরে বসবাস করেন, এবং জরুরি সহায়তা পাওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত—যেমন উপসাগরীয় যুদ্ধ বা ইয়েমেন সংকট—এর সময় অনেক বিদেশি শ্রমিককে হঠাৎ দেশে ফিরতে হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা ও জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য নীতিগত প্রস্তুতি জরুরি। প্রথমত, শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সহায়তার জন্য দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। তৃতীয়ত, দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতি থাকা উচিত।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারে—প্রবাসী আয়, শ্রমবাজার বা জ্বালানি ও পণ্যের মূল্যের মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি উত্তেজনা আমাদের জন্য শুধু দূরবর্তী কূটনৈতিক খবর নয়; এটি অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ইরান–ইসরাইল উত্তেজনা যদি বড় সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তা বাংলাদেশের রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির ওপরও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। এখনই দরকার দূরদর্শী কূটনীতি, শ্রমবাজার বৈচিত্র্য এবং প্রবাসী সুরক্ষার সমন্বিত নীতি। প্রবাসীদের ঘামে গড়ে ওঠা রেমিট্যান্সের প্রবাহই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি—এবং সেই শক্তিকে টিকিয়ে রাখাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: শিক্ষক, সোশ্যাল এক্টিভিস্ট ও বিশ্লেষক।



ডেল্টা টাইমস্/সিআর/আইইউ









  সর্বশেষ সংবাদ  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com