স্বাধীনতা এসেছে, মুক্তি আসেনি

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। দিনটি এক গৌরবময় অধ্যায়ের স্মারক, যেখানে বাঙালি জাতির বীরত্ব, সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের

2026-03-29T09:25:48+06:00
2026-03-29T09:25:48+06:00
রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২

স্বাধীনতা এসেছে, মুক্তি আসেনি
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: রোববার, ২৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:২৫ এএম   (ভিজিট : ৪০)

২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। দিনটি এক গৌরবময় অধ্যায়ের স্মারক, যেখানে বাঙালি জাতির বীরত্ব, সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের অমর কাহিনি জড়িয়ে আছে। একাত্তরের রক্তঝরা পথ বেয়ে যে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল, তা আজ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অগ্রযাত্রাকে আলোকিত করছে।১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল, তখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কথা দিয়েছিল যে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে। সমাজকাঠামো কথা দিয়েছিল সে একটি শোষণমুক্ত সমাজের হবে, যেখানে সব মানুষ সমান অধিকার নিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে আশ্বাস শোনা গিয়েছিল সমতাভিত্তিক উন্নয়নের এবং বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের জন্য উন্নততর জীবনমানের। সাংস্কৃতিক বলয়ে কথা দেওয়া হয়েছিল যে সৃজনশীলতা, মুক্তবুদ্ধি ও স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে গড়ে তোলা হবে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা যুগ যুগ ধরে আমাদের জাতিসত্তার গর্বের আধার হবে। কিন্তু গত পঞ্চান্ন বছরের পথপরিক্রমায় এসে আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন বড় দুঃখ ও কষ্টে শুধু এটুকুই বলতে পারি, আমরা আমাদের কথা রাখিনি। ১৯৭১ সালে ২০ বছর বয়সের যুবক আমার জীবনের এ প্রান্তে এসে পঞ্চান্ন বছর বাদে এ প্রশ্ন করা কি সংগত, আমরা আর কত বড় হব? এবং কাকেই-বা সে প্রশ্ন করব, এর উত্তর শুধুই অজানা। কথা দেওয়া হয়েছিল যে সর্ব অর্থেই বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি; শুধু পশ্চিমা গণতন্ত্রের একটি কাঠামো নয়। আমরা সবাই সর্বস্তরে প্রতিনিয়ত গণতন্ত্রের চর্চা করে যাব, আমাদের গণতান্ত্রিক কার্যকলাপ শুধু নির্বাচন আর সংসদপ্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। 

সৃজনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, দায়বদ্ধতা আর ন্যায়বোধের ভিত্তিতে আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য গড়ে তুলব। অথচ আমাদের ৫৫ বছরের ইতিহাস এটা সাক্ষ্য দেয় না যে আমরা আমাদের কথা রাখতে পেরেছি। রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কথা যদি তুলি, তাহলে গত পঞ্চান্ন বছরের একটি বড় সময়েই আমাদের রাজনৈতিক কাঠামো একনায়কতন্ত্র, সামরিক জান্তা অথবা অন্যান্য অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার হয়েছে। সুখের বিষয় এবং স্বস্তির কথা যে বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছুদিনের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সরকারকাঠামো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পেরেছে। নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু এ উত্তরণ পরে আর নিরঙ্কুশ থাকতে পারেনি। সন্ত্রাস, রক্তপাত, অস্থিরতা এবং অর্থবল এসব নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করেছে নানাভাবে, যাদের হাতে আমরা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করেছি, তারা বিশ্বাসযোগ্য কাজ করতে পারেনি। ফলে নানা সময়ে জনগণের ইচ্ছার সঠিক প্রতিফলন আমরা নির্বাচনী রায়ে প্রতিফলিত হতে দেখিনি। সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও একটি সুস্থ আবহাওয়ার অনুপস্থিতিতে আমরা ব্যথিত ও নিরাশ হয়েছি বারবার। সরকারি ও বিরোধী দল নিয়ে যে সরকার-এ অনুপেক্ষ সত্য আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিস্মৃত হয়েছে প্রতিনিয়ত। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদই হচ্ছে চূড়ান্ত স্থান, যেখানে জনপ্রতিনিধিরা নীতিমালা নিয়ে, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনায় বসেন, দেশ ও সমাজের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেন। আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রায়ই হয়নি। রাজনৈতিক গণতন্ত্রের একটি দিক হচ্ছে আইনের শাসন। পঞ্চান্ন বছরে যদি কোনো ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি অবক্ষয় ঘটে থাকে, সেটা হচ্ছে আইন ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে। 

আমাদের দেশে আইন গ্রন্থেই আছে, বাস্তবায়নে নেই। বিচারের বাণী আজ নিভৃতে নীরবে কেঁদে যাচ্ছে অহরহ। অথচ পঞ্চান্ন বছর আগে আমাদের কি এ কথা দেওয়া হয়নি যে আর কিছু না হোক, বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুবিচার পাবে। আজ আইনের স্থান করে নিয়েছে অস্ত্র, শৃঙ্খলার স্থানে এসেছে সন্ত্রাস। ঘরে-বাইরে সব বিরোধ আর মতানৈক্যের নিষ্পত্তি হচ্ছে অস্ত্রের মাধ্যমে এবং সব সমস্যার সমাধান আমরা খুঁজছি সন্ত্রাসের মধ্যে। সমাজের এ অস্ত্রীকরণ ও সন্ত্রাসায়ন গণতান্ত্রিক সব মূল্যবোধকে বাধাগ্রস্ত করছে। কিন্তু এমনটা কি কথা ছিল? বহু ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতা ও দায়বদ্ধতার মতো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেও আমরা হেলায় উড়িয়ে ফেলেছি; না ব্যক্তিজীবনে, না পারিবারিক জীবনে, না সামাজিক জীবনের কর্মকাণ্ডে আমরা দৃশ্যমানতাকে সামনে তুলে ধরতে পেরেছি। আমরা মনে যা ভেবেছি, মুখে তা বলিনি; মুখে যা বলেছি, কাজে তা করিনি; একজন মানুষের দায়বদ্ধতা সবার আগে তার নিজের কাছে-এটা আমরা স্থায়ীভাবে ভুলেছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা যে গণতন্ত্রের একটি সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি-না ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনে, না সামাজিক অঙ্গনে, না রাষ্ট্রীয় বলয়ে। সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর পরমতসহিষ্ণুতাকে আমরা আমাদের সংস্কৃতির অংশ করতে পারিনি। আমরা নিজের কথা শোনাতে যত ব্যস্ত হয়েছি, অন্যের কথা শুনতে ততটা আগ্রহী হইনি। ন্যূনতম মূল্যবোধও আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। আমার মত আর পথকেই আমরা চূড়ান্ত বলে মনে করেছি, অন্য সব মত আর পথের বিপক্ষে আমরা খড়্গহস্ত হয়েছি, তা নির্মূল করতে তৎপর হয়েছি বারবার। ফলে গণতন্ত্র যে শুধু একটি ধারণা নয়, শুধু একটি ব্যবস্থা নয়, এটা যে নিরন্তর একটি চর্চা, তা আমরা বিস্মৃত হয়েছি। সামাজিক বলয়ে আমাদের কথা না রাখার ঝোলাটাও কম ওজনদার নয়। 

শোষণমুক্ত সমাজের কথা পঞ্চান্ন বছর আগে আমরা যখন বলেছিলাম, তখন তার মূল কথা ছিল ধর্ম, জাতি, নারী-পুরুষ এবং আর্থিক অবস্থার নিরিখে বাংলাদেশের সব মানুষের সমান অধিকার থাকবে। আমাদের বহুত্ববাদই হবে আমাদের শক্তির উৎস। আমাদের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বৈষম্য থাকবে না, আমাদের ব্যক্তি-বিশ্বাস থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় দলন থাকবে না। সমাজবলয়ে আমরা ভেবেছিলাম যে শিক্ষা অর্জন একটি গণতান্ত্রিক অধিকার হবে,শিক্ষা হবে বিজ্ঞানসম্মত,সমকালোপযোগী ও গণমুখী। কিন্তু কোথায় আমরা আজ? হাজার হাজার টাকার কোচিং-যেখানে বিজ্ঞানমনস্কতার চিহ্নমাত্র নেই। সুশিক্ষা আজ বিলাসসামগ্রী এবং সেখানে বিত্তবানদেরই প্রবেশাধিকার আছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা স্তরের বিভাজন উচ্চপর্যায়ের এবং সে বিভাজনের কারণে সমাজে শ্রেণিবিভাজন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও গভীর হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণের ফলে শিক্ষা হয়ে উঠেছে ক্রমাগতভাবে অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে। অথচ পঞ্চান্ন বছর আগে কথা হয়েছিল যে শিক্ষা অঙ্গনকে মুক্তধারা ও মুক্তচিন্তার ক্ষেত্রভূমি করা হবে। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি থাকবে, যার মধ্যে থাকবে সৃজনশীলতা, গতিময়তা, গণমুখিতা; শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক ব্যবস্থার লেজুড়বৃত্তি করবে না। মোটাদাগে অর্থনৈতিক নির্দেশকের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বেশ কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সে উন্নয়নের সুফল কতটা পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের কাছে? অর্থনৈতিক সম্পদ ও সুযোগে দরিদ্র মানুষের অধিকার কতখানি নিশ্চিত করা গেছে? ধনী কর্তৃক দরিদ্রের শোষণ কতটা রোধ করা গেছে? সমাজে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য কি বেড়েছে? দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালায় নগরকেন্দ্রিকতা কি তীব্র নয়? 

সব মিলিয়ে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানকে প্রত্যাশিতভাবে উন্নীত করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কোনো ভূমিকা নেই। বিনিয়োগের সুযোগ-তা সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেই হোক কিংবা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই হোক, সেটা সীমাবদ্ধ থেকেছে সম্পদশালীদের মধ্যেই। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র অর্জিত হয়নি, শোষণ রয়েছে আগের মতোই-শুধু তার পদ্ধতি আর রূপ পাল্টেছে।পঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ভঙ্গকারী রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, অর্থনৈতিক কাঠামো নয়-সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ভঙ্গকারী আমরা, ব্যক্তিমানুষেরা। ১৯৭১ সালে আমরা, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের মানুষেরা, দৃঢ়ভাবে শপথ নিয়েছিলাম যে এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করব, এ দেশকে গড়ে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করব। আমরা তো সে কথা রাখিনি। ব্যক্তিগত আর গোষ্ঠীগতভাবে আমরা শক্তির কাছে, অর্থের কাছে, জীবনের মোহের কাছে পরাজিত হয়েছি। দেশের কাছে, মানুষের কাছে, সময়ের কাছে আমরা যে কথা দিয়েছিলাম, তা আমরা রাখিনি বা রাখতে পারিনি।মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত বিজয় তখনই আসবে, যখন স্বাধীনতার চেতনা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নেও কার্যকর হবে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  সর্বশেষ সংবাদ  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com