ডিপ স্টেট: ঝুঁকিতে আইনের শাসন

খন্দকার রামীম হাসান পায়েল

মতামত

সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বিশেষ আলোচনা সভায় এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের দেয়া বক্তব্যের জেরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের

2026-03-31T15:29:07+06:00
2026-03-31T15:29:07+06:00
রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২

ডিপ স্টেট: ঝুঁকিতে আইনের শাসন
খন্দকার রামীম হাসান পায়েল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬, ৩:২৯ পিএম   (ভিজিট : ১৪৫)
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বিশেষ আলোচনা সভায় এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের দেয়া বক্তব্যের জেরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম হয়েছে। জুলাই-পরবর্তী দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অঙ্গনে ডিপ স্টেটের অদৃশ্য প্রভাব এবং সরাসরি দেশের শাসনব্যবস্থায় তাদের অবাধ বিচরণ জনমনে সুশাসন নিয়ে সংশয়ের জন্ম দিয়েছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ডিপ স্টেট বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে একটা হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করার প্রবণতা দেখিয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের চরম অবমাননার শামিল। আসিফ মাহমুদের মতে, ডিপ স্টেট চেয়েছিল নির্বাচন ২০২৯ সাল অবধি পিছাতে। এজন্য প্রয়োজনে বিএনপির বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবৃন্দ, যারা কোনো মামলায় অভিযুক্ত কিংবা সাজাপ্রাপ্ত, তাদের মামলার ডেট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিংবা অন্য পন্থায় দীর্ঘায়িত করার পরামর্শ দিয়েছিল ডিপ স্টেট। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায়, আধুনিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই অদৃশ্য শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা জনরোষের ভয়ে সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থান বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। বরং তাদের লক্ষ্য থাকে কীভাবে আদালত এবং আইনি প্রক্রিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করা যায়। অর্থাৎ, জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ডিপ স্টেট যে 'ল-ফেয়ার' (Lawfare) নীতি অনুসরণ করে প্রতিপক্ষ কিংবা ভিন্নমতকে দমন করার চেষ্টা দেখিয়েছে, তা স্পষ্ট।

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা ডিপ স্টেটের অস্তিত্ব নিয়ে যুগ যুগ ধরে সচেতন মহলে সীমাহীন কৌতূহল দেখা গেছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ডিপ স্টেট শব্দটির জন্ম। মূলত এটি একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক, যা সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রভাবশালী ব্যবসায়িক বা বৈদেশিক গোষ্ঠী ইত্যাদির মাধ্যমে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে শাসনতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে। জার্মান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরনস্ট ফ্র্যাংকেল তার বিখ্যাত 'ডুয়াল স্টেট' (The Dual State) তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে আইনের শাসনের ক্ষেত্রে দেশের জনগণকে দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত করা হয়; যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বর্তমান থাকে, অপরদিকে ডিপ স্টেট বা প্রভাবশালীরা থাকে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, আসিফ মাহমুদ ডিপ স্টেটের সাথে আলোচনার কথা উল্লেখ করলেও তাদের নাম প্রকাশ করেননি। সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও মার্চ মাসে রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে ডিপ স্টেটের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করেছিলেন, কিন্তু তিনিও এ বিষয়টা স্পষ্ট করেননি। প্রশ্ন প্রকট হয়ে যায়—ডিপ স্টেট কি তবে দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে? যদি এমনটাই হয়, তবে সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনের শাসন অর্থাৎ "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী", তা শুধু কাগুজে পাতায় লিপিবদ্ধ; বাস্তবে এর অস্তিত্ব চরম সংকটাপন্ন।

আমরা স্বাধীনতার ৫৫ বছরে পদার্পণ করেছি। বস্তুত জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চায়নে প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ। জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২-এ নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের পবিত্র দায়িত্ব শাসকগোষ্ঠীর হাতে অর্পণ করা হলেও, ইতিহাসের মাপকাঠিতে এই বিচারিক স্বাধীনতার স্বাদ বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে আকাশকুসুম চিন্তা ছাড়া কিছুই নয়। সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেয়া হলেও অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)-এর অধীনে আবার রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত সকল কাজ করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে বাধ্য এবং এই পরামর্শের ব্যাপারে আদালত কোনো তদন্ত করার এখতিয়ার পাবে না। অর্থাৎ দিনশেষে ক্ষমতাসীনের হাতেই বিচারিক স্বাধীনতা মুষ্টিবদ্ধ। দুঃখের বিষয়, শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার আসনের ভিত্তি মজবুত করতে বারংবার বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করার প্রবণতা প্রকৃত সুশাসনের স্বপ্নকে করেছে চুরমার, আইনের শাসনকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ডিপ স্টেটের মতো ক্ষমতাধররা বিচার বিভাগ ও আইনের শাসনকে দেখিয়েছে বৃদ্ধাঙ্গুলি।

ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট-এর ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বাংলাদেশে আইনের শাসনের বাস্তবতাকে আরও স্বচ্ছ করে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে। রুল অব ল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩টি দেশের মধ্যে ১২৫তম। বস্তুত বাংলাদেশের আইনের শাসনের কফিনে পেরেক মারার অনুষ্ঠান অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে। আর যার যথাযথ সুযোগ লুফে নিচ্ছে অলিগার্ক বা ক্ষমতাধর গোষ্ঠী। জনমনে আজ অস্থিরতার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। যখন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ জানেন কারা এই ডিপ স্টেট, তবে কেন তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে না যথাযথ ব্যবস্থা! কেন সরকার ও রাজনৈতিক মহল সুযোগ করে দিচ্ছে ডিপ স্টেটকে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যদি জনগণ ও আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রয়ে যায় সকল কিছুর ঊর্ধ্বে, তখন গণতন্ত্রের সমাধি ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই স্বাধীন ভূখণ্ডে কোনো অদৃশ্য শক্তির ইশারা নয়, বরং স্বাধীন বিচার বিভাগ ও আইনের শাসনই হোক সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী—স্বাধীনতার ৫৫তম বছরে এসে এটাই হোক আমাদের একমাত্র দাবি ও প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, 
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


ডেল্টা টাইমস্/আইইউ








  সর্বশেষ সংবাদ  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com