প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া

প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া

নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে খালেদা জিয়া চলে গেছেন অনন্তলোকে। গণতন্ত্র, পরমতসহিষ্ণুতা ও দেশপ্রেমের তুলনারহিত এক প্রতীক তিনি। দেশের মানুষের হৃদয়ে-মননে, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায়, চর্চায়, সংকটে-স্বপ্নে তিনি অবধারিতভাবে যুক্ত থাকবেন। তাঁর ত্যাগ, দৃঢ়তা, দূরদর্শী প্রজ্ঞা, আপন মৃত্তিকা ও মানুষের প্রতি সুগভীর অঙ্গীকার আমাদের সব সময় শক্তি ও সাহস জোগাবে। আমাদের সৌভাগ্য যে তাঁর মতো অবিচল আপসহীন প্রত্যয়ী একজন দেশনেত্রীকে আমরা পেয়েছি। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, দেশাত্মবোধ স্বপ্নে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনিঃশেষ প্রেরণা ও পাথেয় হয়ে থাকবে। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে যত চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদাতবরণের পর গৃহকোণ ছেড়ে তাঁকে জটিল-কুটিল অস্থির রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করতে হয়। সম্প্রীতি এমনই এক সূক্ষ্ম অথচ অনিবার্য উপাদান, যা চোখে দেখা না গেলেও মনশ্চক্ষু বা অন্তরাবলোকন দিয়ে গভীরভাবে অনুভব করা যায়। এটি শুধু শান্ত বা নীরব থাকার নাম নয়; এটি আসলে পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারা, উভয়ের প্রতি নীতি ও আদর্শগত সাম্য এবং সর্বোপরি এক গভীর মানবিক বিবেচনাবোধের সম্মিলিত ফল। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যখন সহযোগিতা, আস্থা ও বিশ্বাসের হাত প্রসারিত হয় এবং সেই হাতগুলো অটুটভাবে আবদ্ধ হয়, তখনই একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে সত্যিকারের সম্প্রীতির আবহ গড়ে ওঠে। এই আবহ জাগতিক নিয়মে এককভাবে তৈরি হয় না-এটি নিজের পরিবার থেকে শুরু হয়ে গ্রাম, সমাজ, জেলা, বিভাগ পেরিয়ে অবশেষে সমগ্র বিশ্ব দরবারে জাতির পরিচয় বহন করে। আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে সেই প্রত্যাশা যখন নাগরিকদের মনে দানা বাঁধে, তখন সামাজিক শৃঙ্খলার মাঝে ঐক্য, প্রীতি ও মৈত্রীর বন্ধনে নিজেদের মধ্যে পূর্ণ সম্প্রীতি গড়ে তোলাটাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সেই পথেই আজ এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। 

ঠিক এমন এক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আজ দেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে অবশেষে সবাইকে কাঁদিয়ে, সব বন্ধন ছিন্ন করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আমাদের মাঝ থেকে তিনি চিরবিদায় নিলেন। দেশে বিভাজনের রাজনীতির মধ্যে তিনি ছিলেন সম্প্রীতি ও মেলবন্ধনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। মানুষের ভালোবাসা নিঃসৃত বহু উপাধি পেয়েছেন।তাঁর অসুস্থতার মধ্যে দেশে- বিদেশে সেসব উপাধি নানাভাবে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বাস্তবভিত্তিক উপাধিটা হয়তো হতে পারে দেশমাতৃকা। এই উপাধির উত্কৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ দেশপ্রেম, সততা, ঐক্য আর রাজনৈতিক সম্প্রীতির এক মূর্ত প্রতীক। রাজনীতিতে পা বাড়ানোর শুরুতেই যাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ সরকারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে উজ্জ্বল ঊষার আলোকবর্তিকা হয়ে বিরাজ করেছেন, খালেদা জিয়া তাঁদের মধ্যে অদ্বিতীয়। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বেগম খালেদা জিয়ার ওপর নিষ্ঠুরতম আচরণ করেছেন। বাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার পর রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে ফরমায়েশি রায়ে তাঁকে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে নেওয়া হয়। এতেও তিনি ক্লান্ত হননি। কারাগারে বিনা চিকিৎসায় বেগম খালেদা জিয়া কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁকে কোনো উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রতিনিয়ত দেশ ও বিদেশের কোটি কোটি নাগরিক তাঁর জন্য দোয়া করেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অবিরাম চেষ্টা করেছেন তাঁকে সুস্থ করে তুলতে। গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় তিনি দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের আপসহীন নেত্রী, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি সময়ের আবর্তনে বিশ্ব রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক উজ্জ্বল মুখ। মিছিলের পুরোভাগে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক উন্নত শির, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং আপসহীন নেত্রী। অন্যায়, অনিয়ম, অবিচারের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি স্বৈরাচার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। জনগণ তাঁকে বিপুল ভোটের মাধ্যমে পাঁচবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে উনিশ শো একানব্বই থেকে দুই হাজার আট সালে বিজয় অর্জন করেন। চারবার তিনি পাঁচটি করে আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হন এবং একবার তিনটি আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশের সেরা রেকর্ড নয়, বিশ্বের কাছেও অনন্য রেকর্ড। বেগম জিয়া মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন গণতন্ত্র ছাড়া কোনো দেশ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। ২০১১ সালের ২৪ মে তাঁকে গণতন্ত্রের যোদ্ধা হিসেবে উপাধি দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেট সিনেট। দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি অনন্য উদাহরণ। যোগ্যতা ও কাজ অনুযায়ী দলের এবং সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন, কমিটি গঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যাবলি পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি গণতান্ত্রিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি নেতাকর্মীদের কথা বেশি শুনতেন, বারবার শুনতেন এবং তারপর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। বেগম খালেদা জিয়া সরকারের আমলে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শুধু তৈরি পোশাক শিল্প খাতেই প্রথম পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাক শিল্প খাতে যোগ দিয়েছিলেন। 

তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানিবণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন, যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাঁকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনিই প্রথম রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মায়ানমার সরকার নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন।বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনা করেন। ব্যক্তিগত আয়কর প্রদানের হার ৫৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নিয়ে আসেন। ব্যবসায় সহজ করার লক্ষ্যে ২৭ ধরনের শুল্ক হ্রাস করে সাত ধরনের আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করেন। দেশের ভূভাগের খনিজ সম্পদকে কাজে লাগাতে বড়পুকুরিয়ায় কয়লা খনি ও মধ্যপাড়ার শ্বেতপাথরের খনি থেকে উত্তোলন কার্যক্রমের সূচনা তাঁর সরকারের আমলেই করা হয়। এ ছাড়াও ভোলা, বঙ্গোপসাগর ও দিনাজপুরে তাঁর শাসনকালে নতুন প্রাকৃতিক গ্যাসের খনির সন্ধান পাওয়া যায়। নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯ নম্বরে স্থান করে নেন তিনি। বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে এক রূপান্তরমূলক নেতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নারীর সামাজিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেন এবং শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষমতায়নে ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়ন করেন। এভাবেই বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তাই তো বলি,মহীয়সীর মৃত্যু হয় না। তিনি আমাদের মাঝে আছেন। থাকবেন। জাতীয় সংকটে, সংগ্রামে, স্বপ্নজয়ের প্রত্যয়ে তাঁর কাজ ও আদর্শ অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাবে আমাদের। শোক পরিণত হোক শক্তিতে। বেদনাহত উপলব্ধি হয়ে উঠুক প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐক্যের বীজমন্ত্র।


লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]