৭২’র সংবিধান বাতিল এই মুহূর্তে সম্ভব নয় : মির্জা ফখরুল
ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪, ২:৫৪ পিএম

৭২’র সংবিধান বাতিল এই মুহূর্তে সম্ভব নয় : মির্জা ফখরুল

৭২’র সংবিধান বাতিল এই মুহূর্তে সম্ভব নয় : মির্জা ফখরুল

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তন এসেছে। নানা হিসাবনিকাশ কষতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নতুন এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন অনেক উজ্জীবিত। জাতীয় নির্বাচনের জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ২০২৫ সালের মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়া সম্ভব। দ্রুত নির্বাচন হলে যে সংকটগুলো তৈরি হচ্ছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে। দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে। ভোটের অধিকার যদি প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে রাস্তায় নামতেই হবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’-এর খসড়া প্রস্তাবে বাহাত্তরের সংবিধান বাতিলের যে দাবি এসেছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দাবি এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। ভবিষ্যতে যদি কখনো সুযোগ ও সময় আসে, তখন জাতির চিন্তা করে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

দেশের অন্যতম জাতীয় দৈনিক যুগান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলকে সুসংগঠিত করা এবং নির্বাচনের প্রস্তুতির নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও ভোটে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে বলেন, এ সিদ্ধান্ত আসবে জনগণের কাছ থেকে। এছাড়া দেশের চলমান পরিস্থিতি, জাতীয় নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কার, যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, নতুন দল গঠন, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গ, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক, মাইনাস টু ফর্মুলা, চিকিৎসার জন্য চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরাসহ নানা বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব।

সম্প্রতি লন্ডন সফরে গিয়েছিলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে কী বার্তা নিয়ে এসেছেন। এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়াম্যান এখন দলের মূল দায়িত্বে রয়েছেন। তার সঙ্গে কথা বলেছি, উদ্দেশ্যও সেটা ছিল। সেখানে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা-সবকিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দল সুসংগঠিত করতে হবে এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে-এটাই হচ্ছে প্রধান বার্তা।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে কবে ফিরবেন এ প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল  বলেন, এখনো সময় নির্ধারণ হয়নি। তার অনেক মামলা আছে। বেশ কিছু মামলা শেষ হয়েছে, আরও কিছু বাকি আছে। মামলা শেষ হলেই উনি চলে আসবেন।

দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে দেশের অস্থিরতা বা সংকট অনেক কমে যাবে বলে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল বলছে। একই সঙ্গে দলগুলো বলেছে এখনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়নি।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা সুস্পষ্ট রোডম্যাপ চেয়েছি। নির্বাচন হলে যে সংকটগুলো তৈরি হচ্ছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে। নির্বাচিত সরকারে মানুষের যে আস্থা, সেই সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের যে শক্তি তৈরি হয়, সেটা অনেক শক্তিশালী হয়। যে কারণে তারা অনেক কাজ করতে পারেন, যা অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না।

জানুয়ারির মধ্যেও নির্বাচনি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না হয়, সেক্ষেত্রে দলের ভাবনা বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা ঠিক এ মুহূর্তে বলতে পারব না। এ মুহূর্তে কোনো বিরোধে কারও সঙ্গে যেতে চাই না। আমি মনে করি, এখন যেটা দরকার-সব বিষয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা আমাদের একটা দায়িত্ব। সেভাবে আমরা কাজ করতে চাই।

অপর এক প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের ভোটের অধিকার যদি জনগণ ফিরে না পায়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা যদি না হয়; তাহলে তো আমাদের রাস্তায় নামতেই হবে। এটা আমাদের কাজ। মির্জা ফখরুল,আমরা সেভাবে কিছু বলিনি। তবে আমরা মনে করি, ২০২৫ সালের মধ্যেই নির্বাচন হওয়া সম্ভব। সেটা ২৫ সালের মধ্যেই সব ব্যবস্থাই নিয়ে নেওয়া যায়, যেগুলো প্রয়োজন নির্বাচনের জন্য।

মির্জা ফখরুল বলেন, হঠাৎ করে দেখলাম ভোটারের ন্যূনতম বয়সসীমা ১৭ বছরের কথা বললেন প্রধান উপদেষ্টা। তো এটা স্বাভাবিকভাবে আমাদের নির্ধারণ করা তো আছেই ১৮ বছর। সেটা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বা অন্য স্টেকহোল্ডাররা তো কেউ কথা বলেননি। সেখানে এটিকে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এই যে বিভিন্নভাবে ছাত্ররা মুভমেন্ট করছেন, সেই মুভমেন্টে বেশিদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার জন্য একটা প্রবণতা দেখা যায়। এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বয়সটা যদি কমানো যায়, সেটা আরও সময় লাগবে। নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করতে হবে। অনেক সময় লাগবে। তো সেই ব্যাপারটার কারণে আমি বলেছি।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, বিএনপি সংস্কার চায় না, নির্বাচন চায়-এটা ঠিক নয়। বিএনপি প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচন চায়। আমরা বারবার বলছি, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যেটুকু (সংস্কার) দরকার, সেটুকু শেষে নির্বাচনে যেতে চাই। নির্বাচন যত দেড়ি হবে, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট তত বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করি, দ্রুত দ্রুত নির্বাচন সম্ভব করতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।


মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা লক্ষ করছি কোনো কোনো ব্যক্তি মাঝেমধ্যে ভিন্নভাবে কথা বলার চেষ্টা করছেন। একাত্তর সালকে অনেকে কটাক্ষ করছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়কে তারা ইগনোর করছেন। সেক্ষেত্রে আমি এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছি যে, একাত্তরকে বাদ দিয়ে আমাদের দেশের জাতির অস্তিত্ব আমরা চিন্তা করতে পারি না।


আরেক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার তো আমাদের সংবিধানেই দেওয়া আছে। এটা আমি মনে করি, সবাই করতে পারেন; কিন্তু সেটা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে তো। মানুষ গ্রহণ করলেই সেই দল কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।

 ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ দেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। নেতারা বলেছেন, ঘোষণাপত্রে বাহাত্তরের মুজিববাদী সংবিধানের কবর রচিত হবে।  এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ছেলেরা তো অনেক অবেগপ্রবণ। যুবক, তাদের তারুণ্যে সবকিছু মিলিয়ে তাদের তো একটা আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। সেভাবে তাদের মতো করে তারা বলেছে। আমি মনে করি, তারা তাদের আবেগ থেকেই বলেছে, তারুণ্য থেকে বলেছে। এটাকে (বাহাত্তরের সংবিধান বাতিলের দাবি) এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। ভবিষ্যতে যদি কখনো সুযোগ আসে, সময় আসে, তখন জাতির চিন্তা করে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি।

‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল  বলেন, আমাদের তো একটা অভিজ্ঞতা আছে, খারাপ অভিজ্ঞতা। ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর সেই অভিজ্ঞতা আমরা দেখলাম যে সরকার এলো, এসে দুই বছর থাকল। দুই বছর থেকে তা হাইকোর্ট থেকে পাস করিয়ে নিল। আমি মনে করি, এ জিনিসগুলো দেখা উচিত। তবে এখন আর মাইনাস টু ফর্মুলা আছে বলে মনে করি না। কিন্তু তারপরও বলেছি, বিএনপিকে মাইনাস করার ক্ষমতা কারও নেই। সুতরাং মাইনাস টু ফর্মুলা এখন আর চলবে না।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির কোনো দূরত্ব আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল : তারাও (জামায়াত) একটা রাজনৈতিক দল, আমরাও একটা রাজনৈতিক দল। অনেক সময় হয় কী-একটি দল আরেকটি দলকে আক্রমণ করে কথা বলে। সেগুলো মাঝেমধ্যেই তো হয়ই। ওভারঅল সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক ভালো, শুধু আওয়ামী লীগ ছাড়া।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কে একধরনের টানাপোড়েন চলছে। এ থেকে উত্তরণের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রথম যেটা হওয়া উচিত, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা পুরোপুরি নির্ভর করবে ভারতবর্ষের আচরণের ওপরে। সে কীভাবে বাংলাদেশকে দেখছে, কীভাবে সে ডিল করছে, এর ওপর। যদি ভারত মনে করে, বাংলাদেশ তার অধীনস্থ একটা রাজ্য, তাহলে ভুল হবে। আর বাংলাদেশে একটি দল থাকবে আওয়ামী লীগ, যাদের সঙ্গে তাদের (ভারতের) সম্পর্ক করতে হবে; তাহলে তারা (ভারত) ভুল করবে। সেই ভুলটা হয়েছে। এজন্যই আমি বরাবর বলে আসছি, আমাদের যেমন একক কোনো বন্ধু থাকা উচিত নয়, ঠিক একইভাবে ভারতবর্ষেরও একক একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা এখানে কোনোমতেই সমীচীন হতে পারে না। এখানে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক হতে হবে।


শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। সেখান থেকে ভার্চুয়ালি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। বিষয়টি দুদেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়ছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল : সম্পর্কে প্রভাব পড়ে গেছে অলরেডি। হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটা অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া আছে। সুতরাং এটা আমি মনে করি, ভারতের উচিত-বাংলাদেশের জনগণের যে ইচ্ছা, এর প্রতি সম্মান রেখে হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়া।




ডেল্টা টাইমস/সিআর

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]