|
দায় স্বীকার করে পদত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে
মো. জিল্লুর রহমান:
|
![]() দায় স্বীকার করে পদত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে এর কয়েকদিন আগে নতুন ডিএমপি কমিশনার জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকার জন্য রাজধানীবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেন, ঢাকাবাসীর কাছে আমি জুলাই-আগস্টের ঘটনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আমি আশ্বস্ত করছি, সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আগামীতে রাজধানীবাসীর সেবা করে যাব। বিগত দিনগুলোতে হেলমেট বাহিনীর সঙ্গে মিলে পুলিশ হামলা করেছে, সেই যুগের অবসান ঘটেছে বলে জানান তিনি। উপরোক্ত দায়িত্বশীল পদে দুজনের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে একেবারেই নতুন। এসব বাহিনীতে যারা অপরাধ করেছে তাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলমান কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তাদের দায় স্বীকার অবশ্যই ইতিবাচক ঘটনা এবং এ ধরনের দৃষ্টান্ত পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময়ে দৃষ্টিগোচর হয়নি। সাধারণত বিদেশে কোন বিমান, রেল, নৌ দুর্ঘটনা বা নীতি নৈতিকতার কোন ব্যত্যয় ঘটলে তার দায় দায়িত্ব নিয়ে কিংবা ভুল স্বীকার করে পদত্যাগ করতে দেখা যায় এবং এটা তাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এটা একদম বিরল। কেউ ক্ষমতা পেলে আর ছাড়তে চায় না, এটা আকড়ে ধরে থাকতে চায়। ভুল স্বীকার করে দায় দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগের তো প্রশ্নই ওঠে না! কারণ বাংলাদেশে কোন জনপ্রতিনিধি বা দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত হতে হলে তাকে অনেক অর্থকড়ি, তদবির ও কাঠগড় পেরিয়ে নির্দিষ্ট পদে অধিষ্ঠিত হতে হয় এবং সে পদটা তার কাছে বহু কাঙ্ক্ষিত ও লোভনীয় হয়ে ওঠে। এসব কারণে সে সমালোচনা কিংবা আন্দোলন সংগ্রামকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করে না এবং স্বেচ্ছায় পদত্যাগ তো দূরের কথা, শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। বিদেশে দোষ বা ভুল স্বীকার করে দায় দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগের বহু দৃষ্টান্ত আছে। যেমন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনাভাইরাস মহামারীর লকডাউনের মধ্যেই ২০২০ সালের মে মাসে নিজের সরকারি বাসায় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি মদ্যপানের পার্টি আয়োজন করেছিলেন। তিনি উক্ত ঘটনা নিয়ে বিরোধীদের পদত্যাগের দাবী ও প্রচন্ড সমালোচনার মুখে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে ‘আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা’ করেন। পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, তার ও সরকারের ওপর সমালোচকদের ক্ষোভের বিষয়টি বোধগম্য। কারণ, তিনি মনে করেন যে ডাউনিং স্ট্রিটে নিয়মগুলো যারা তৈরি করে, তারাই সেগুলো সঠিকভাবে মেনে চলে না এবং এটা হতে পারে না। এছাড়া জানা যায়, ১৯৫৬ সালে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে এক রেল দুর্ঘটনায় ১১২ জন যাত্রী মারা যান। তৎকালীন রেলমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী এই দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করে সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বিস্মিত হয়ে বলেন— দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু পদত্যাগ করতে হবে কেন? তিনি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। কিন্তু এই ঘটনার তিন মাস পরে তামিলনাড়ুতে আবার একটি রেল দুর্ঘটনা ঘটে। এ বার ১৪৪ জন যাত্রী মারা গেলেন। বিবেকের দংশন থেকে ঘটনার দায় মাথায় নিয়ে লালবাহাদুর শাস্ত্রী আবার পদত্যাগ করেন। এ বার প্রধানমন্ত্রী নেহরু পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। তখন সংসদে বিবৃতি দিয়ে নেহরু বলেছিলেন, “যদিও তিনি পদত্যাগ করেছেন, এবং আমরা তা গ্রহণ করেছি, এর মানে এই নয় যে মিস্টার শাস্ত্রী তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। পদত্যাগ পত্র এ কারণে গ্রহণ করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে ও শিখতে পারে, তিনি সংবিধান, গণতন্ত্র ও দায়িত্বের প্রতি কতটা সৎ এবং নিবেদিত ছিলেন।” চলতি ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারী নরওয়ের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী স্নাতকোত্তরের গবেষণামূলক প্রবন্ধে অন্যের গবেষণা চুরি করার কথা স্বীকার করে পদত্যাগ করেছিলেন। সংবাদ সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি খুব বড় ভুল করার কথা স্বীকার করেছেন। সূত্র উল্লেখ না করেই বিভিন্ন জনের লেখা গবেষণাটিতে ব্যবহার করায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমি একটি বড় ভুল করেছি এবং উৎসের ক্রেডিট ছাড়াই অন্যান্য গবেষণামূলক তথ্য ব্যবহার করেছি। আমি দুঃখিত। এর আগে নরওয়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার চৌর্যবৃত্তি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে গ্রিসের অবকাঠামো ও পরিবহনমন্ত্রী ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পদত্যাগের ঘোষণা দেন। জানা যায়, তখন গ্রিসের উত্তরাঞ্চলে দুটি ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে কমপক্ষে ৪৩ জন নিহত হয় এবং ওই ঘটনায় ব্যর্থতার দায় নিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। তখন তিনি জানান, এমন মর্মান্তিক ঘটনা যখন ঘটেছে, তখন কিছু না ঘটার ভান করে কাজ চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি এই ব্যর্থতার দায় নিচ্ছি এবং পরিবহনমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিচ্ছি। ট্রেন দুর্ঘটনায় যে মানুষেরা মারা গেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ পদত্যাগ করাই আমার কর্তব্য। নিহতদের পরিবারের প্রতি আমি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। একইভাবে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিথ্যা বলার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। জানা যায়, তিনি ২০০৬ সালে শেল কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে একটি বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন মর্মে মিথ্যা বলেছিলেন। সে কলংকের দায় মাথায় নিয়ে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এ নিয়ে সে দেশে পার্লামেন্টে বিতর্ক শুরু আগ মুহূর্তে অনুতপ্ত হয়ে তিনি তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। আবেগ কাতর হয়ে এসময় সাংবাদিকদের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘‘এটাই আমার পুরো পেশাগত জীবনে করা সবচেয়ে বড় ভুল এবং এই ভুলের মধ্য দিয়ে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমি আমার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছি। অথচ এই পদে বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টি হতে হয় প্রশ্নাতীত ও সন্দেহাতীত।" তিনি এর আগের দিন ডাচ একটি পত্রিকা দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, ২০০৬ সালে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল বলে তার করা বক্তব্যটি ছিল মিথ্যা। আসলে মানুষ হিসেবে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে চান। পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক কাজকর্ম ও পেশাগত ক্ষেত্রসহ সর্বত্র দক্ষতার প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। এটা অর্জনের অন্যতম পদ্ধতি হলো সাবলীলভাবে সত্যপথ অবলম্বন করা। মিথ্যা বর্জন করে ভুলত্রুটি স্বীকারের মানসিকতা গড়ে তোলা। সম্মিলিত কাজের ক্ষেত্রে সবেচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো নিজের কোনো ভুল স্বীকার না করা। নিজের দোষকে ইনিয়ে-বিনিয়ে, ছলে-বলে কিংবা কৌশলে অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া। এমন অভ্যাস কোনো আদর্শ সহকর্মী কিংবা নাগরিকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। তবে কোন মানুষই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। অতএব কোনো ভুল হলে তা সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করা মহত্ত্বের লক্ষণ। ভুল স্বীকারে কোন লজ্জা নেই, বরং এটা গৌরব ও সম্মানের এবং আত্মমর্যাদাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। ভুল শুধরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এটা অন্যের নিকট গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার কারণও বটে। চলার পথে মানুষেরই ভুল হয়, কেউ যখন ভুল বুঝতে পারে তা শুধরে নেয়। তবে কেউ আবার নিজের ভুলের ওপর গোঁ ধরে বসে থাকেন। অনেকেই মনে করেন, ভুল স্বীকার করা ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী। এ কারণে সম্মানহানি ঘটবে। অথচ বিষয়টি এমন নয়। মানুষ ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। আর মহৎ গুণগুলোর একটি হচ্ছে কৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া। ভুল করে ক্ষমা প্রার্থনা করবে এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। যাই হোক, র্যাবের ডিজি কিংবা ডিএমপি কমিশনার তাদের বাহিনীর দোষ স্বীকার করলেও জুলাই আগস্ট আন্দোলনের মৃত্যুর দায় কিন্তু কারো না কারোর ওপর বর্তায়। কিন্তু কে নেবে সেই দায়? আমাদের দায়িত্বের চেয়ারে বসা মানুষের অভাব নেই। কিন্তু দায় নেওয়া মানুষের বড় অভাব। আমাদের দেশে এ ধরনের দৃষ্টান্ত বা সংস্কৃতিও এখনও গড়ে ওঠেনি। কখনো কি শুনেছেন দেশে দুর্ঘটনার দায় নিয়ে কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন? আমরা শুনিনি। কারণ আমাদের এমন একদম বোকা বা অতি বুদ্ধিমান মন্ত্রী কখনও ছিল না, যে পদত্যাগ করে চেয়ার ছাড়বে! তারা জানেন একবার ছেড়ে দিলে ওই চেয়ারে হয়তো আর বসা হবে না। তাই এমন ভুল তারা করেন না। আমাদের পতিত পলাতক প্রধানমন্ত্রীও তার দোষ কি সেটাই খুঁজে পান না, দায় দায়িত্ব তো পরের বিষয়! তিনি মিডিয়ার সামনে কিছু একটা বলে হুমকি ধামকি ও কান্নাকাটি করছেন। তাদের কেউ তো মারা যাননি। যাদের গেছে, কিছু একটা ক্ষতিপূরণ দিলেই হয়ে গেল! একদম সহজ সমাধান। কিন্তু বিদেশে পদত্যাগের এ রকম বহু দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু কবে আমাদের দেশে ভুল বা দোষ স্বীকার করে দায় দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করার দৃষ্টান্ত গড়ে উঠবে কিংবা কবে এমন সংস্কৃতি গড়ে উঠবে কথায় নয় কাজে বড় হবে। লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট। ডেল্টা টাইমস্/মো. জিল্লুর রহমান/সিআর |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |