তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

জাতির সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজন হয় দৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। যেমন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর শহীদ

2025-12-21T10:16:34+00:00
2025-12-21T10:16:34+00:00

তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: রোববার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:১৬ এএম   (ভিজিট : ২৬৭)
জাতির সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজন হয় দৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। যেমন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে হতাশায় নিমজ্জিত দেশের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিলেন। যেমন স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আপসহীন সংগ্রামে জাতিকে একতাবদ্ধ করেছিলেন খালেদা জিয়া। যে কারণে জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সব আক্রমণ ও অপপ্রচার মোকবিলা করে টিকে রয়েছে। এই জাতীয়তাবাদ আমাদের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে। আর তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নিজেই ঘোষণা করলেন ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ দেশে ফিরছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার কথা জানালেন তিনি। মা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন মিলিয়ে তারেক রহমান দেশে ফেরার এ সিদ্ধান্ত নেন।একজন নাগরিকের দেশে ফেরার অধিকার অখণ্ড। একজন সাধারণ মানুষ বিদেশে বিপদে পড়লেও রাষ্ট্র তাকে সহায়তা করে। সেখানে তারেক রহমান দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তাঁর দেশে ফেরা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হওয়াই স্বাভাবিক। আর সেই কারণেই তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের আরও বেশি। যদি সরকার সত্যিই নিষ্কণ্টক পরিবেশের কথা বিশ্বাস করে, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল একটি স্পষ্ট, শক্তিশালী এবং বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদান। রাষ্ট্র চাইলে খুব কম সময়ের মধ্যেই তাঁর নিরাপদ দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, এটাই বাস্তবতা।

তারেক রহমানের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি, অথবা দেশে ফিরলে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা, এসবই বাস্তবতার অংশ। স্বাভাবিকভাবেই এসব আশঙ্কা একজন মানুষকে নিরাপত্তাহীন করে তোলে। আর এই নিরাপত্তাহীনতা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কারও নয়। কেবল মুখের কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয় যে তাঁর দেশে ফেরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে ২২ বছর বয়সে বগুড়া জেলার গাবতলী থানা বিএনপির সদস্য হন। আনুষ্ঠানিক ভাবে সংগঠনে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারেক রহমান তাঁর মা খালেদা জিয়ার সহচর হিসেবে সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও মায়ের পাশাপাশি তারেক রহমান দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণা চালান। এই নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতির প্রথম সারিতে তাঁর সক্রিয় আগমন ঘটে। ২০০২ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এর পরই দেশব্যাপী দলের মাঠ পর্যায়ের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে ব্যাপক গণসংযোগ শুরু করেন। একজন দক্ষ সংগঠক ও সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর এই সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বিরোধী পক্ষ অপপ্রচার শুরু করে, যা ভিত্তিহীন ছিল। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় তারেক রহমানকে কারাগারে যেতে হয়, র্নিযাতনের শিকার হতে হয়। এক পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য তাঁকে ২০০৮ সালে লন্ডনেও যেতে হয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তিনি দল পরিচালনায় সম্পৃক্ত হতে থাকেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে নেতৃত্বের অভাব কোনো নতুন বিষয় নয়, কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে এটি সবচেয়ে গভীর। কারণ, জনগণের মধ্যে এখন এক ধরনের হতাশা কাজ করছে।তারা রাজনীতিকে আর আশা হিসেবে দেখে না, বরং ভয় হিসেবে দেখে। 

এ অবস্থায় যদি কোনো নেতা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন, তবে সেটি হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা। তারেক রহমান সে সম্ভাবনার প্রতীক। যদিও এখনো তার বিরুদ্ধে কিছু মামলা চলমান, তবু আইন ও সত্যের বিচার শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্ত করবেএমন বিশ্বাস জনমনে স্পষ্ট। তার প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা আজ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়; এটি জাতীয় পুনরুদ্ধারের আহ্বান। মানুষ এখন এমন এক নেতৃত্ব চায়, যে নেতৃত্ব ক্ষমতার লোভে নয়, দায়িত্ববোধে অনুপ্রাণিত হবে। অতএব, বাংলাদেশের এ দীর্ঘ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে তারেক রহমান শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি এক প্রতীকন্যায়, গণতন্ত্র ও মানুষের মর্যাদার প্রতীক। তিনি যদি ফিরে আসেন, তবে তা শুধু একজন নেতার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের সূচনা হবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং জনগণের আস্থা ক্ষয়ে যায়। তারেক রহমান এ অবস্থার পরিবর্তন চেয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়; গণতন্ত্র মানে মানুষের মৌলিক অধিকার ও অংশগ্রহণ।’ এ বক্তব্যে গণতন্ত্রকে তিনি শুধু নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। রাজনীতির জগতে সময়ই শেষ বিচারক। যে সময় একদিন তাকে বন্দি করেছে, সেসময়ই আজ তার নির্দোষতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন বাংলাদেশের প্রয়োজন এক নতুন সূর্যোদয় যেখানে প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, সহযোগিতা ও ন্যায়ের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। তারেক রহমান সেই নতুন সূর্যের আগমনবার্তা হয়ে উঠতে পারেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ হয়তো আবারও খুঁজে পাবে সেই স্বপ্ন একটি স্বাধীন, সুশাসিত ও অন্তর্ভুক্তি মূলক রাষ্ট্রের, যেখানে গণতন্ত্র কেবল শাসনের পদ্ধতি নয়, বরং জীবনের দর্শন। 

তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা এক অনন্য প্রতিরোধের ইতিহাস। নির্বাসনের বছরগুলো তার জন্য যেমন কষ্টের, তেমনি আত্মবিশ্লেষণের সময়ও ছিল।এ সময়ই তিনি রাজনৈতিক চিন্তায় পরিণত হন। অভিজ্ঞতা তাকে দিয়েছে ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি। আজ তার চিন্তায় যে পরিণত রাজনীতি আমরা দেখি, তা কোনো আকস্মিক প্রাপ্তি নয়; এটি সময়, যন্ত্রণা ও সংগ্রামের ফসল। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণ মূলক হতে চায়, তবে প্রয়োজন হবে এমন এক নেতৃত্বের, যিনি জনগণকে একত্রিত করতে পারবেন। তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি এ ঐক্যবোধ। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমাদের লড়াই কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়, আমাদের লড়াই অন্যায়ের বিরুদ্ধে।’ এ বক্তব্যই তাকে একজন আদর্শবাদী নেতা হিসেবে আলাদা করে তোলে। বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যবসায়িক ও স্বার্থভিত্তিক হয়ে উঠছে। কিন্তু তারেক রহমানের রাজনৈতিক দৃষ্টি এ প্রবণতার বিপরীতে অবস্থান নেয়। তার কাছে রাজনীতি হলো জনগণের সেবা, রাষ্ট্রের মর্যাদা ও স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। তিনি বারবার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নেই।’ এ বক্তব্যে ফুটে ওঠে তার দেশপ্রেম, যা রাজনৈতিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে। তবে এ পথ সহজ নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল ও বিপজ্জনক। বহু বছর ধরে প্রচলিত প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি, দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাবসবই একটি নৈতিক পুনর্জাগরণের পথে বড় বাধা। তারেক রহমান এ বাধা অতিক্রমের জন্য জোর দিয়েছেন কঠোর দুর্নীতি দমন, রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও দলীয় কাঠামোর সংস্কারে। তার বিশ্বাস, নেতৃত্বের যোগ্যতা আসে নৈতিকতা থেকে, এবং দলের শক্তি আসে জনগণের আস্থা থেকে। এজন্য তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতি কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি জনগণের দায়িত্ব। এ বক্তব্যের মধ্যেই নিহিত আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। 

একটি রাষ্ট্র তখনই টিকে থাকে, যখন সেখানে রাজনীতি হয় দায়িত্বের, নয় প্রাপ্তির। বাংলাদেশের আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই দায়িত্ববোধ সম্পন্ন নেতৃত্ব, যারা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, জাতির নিরাপত্তা নিয়ে ভাববে।একটি রাষ্ট্র তখনই স্থিতিশীল হয়, যখন তার নেতৃত্ব জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নেতৃত্বহীনতার শূন্যতা। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশ আজ দিকহারা। ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু নেতৃত্বের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল। এ মুহূর্তে দেশ যেভাবে এক গভীর রাজনৈতিক অভিভাবকহীনতার মধ্যে নিমজ্জিত, সেখানে তারেক রহমানের নেতৃত্ব অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু একটি দলের নেতা নন; তিনি এমন এক চিন্তার ধারক, যা জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের পুনর্গঠনে সক্ষম। দেশের সামগ্রিক রাজনীতির জন্যও একটি ইতিবাচক মোড় ঘোরানোর বার্তা বহন করছে। তারেক রহমান এখন আর শুধুই বিএনপির নেতা নন-তিনি হয়ে উঠছেন এক নতুন রাজনৈতিক যুগের প্রতীক, যেখানে নেতৃত্বের শক্তি নির্ভর করছে জনআস্থা, প্রজ্ঞা ও পরিমিত দায়িত্ববোধের ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের কণ্ঠে যে আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা শোনা গেছে, তা তাঁর দীর্ঘ প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক পরিণতি পূর্ণতারই প্রতিফলন। তাই তো তিনি দেশে ফেরার সময় নির্দিষ্ট করে ঘোষণা দিয়ে দেশের জনগণসহ তাঁর দলের প্রতি অগ্রাধিকার যাত্রার আশার বাণি শোনালেন। প্রায় দেড় যুগ ধরে প্রবাসে থেকেও তিনি বিএনপিকে সংগঠিত রেখেছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দমননীতির মধ্যে নেতা-কর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন এবং দেশব্যাপী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি এখন এক নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করছে-সংঘাত নয়, কৌশল ও সংগঠনের শক্তিতে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই









  সর্বশেষ সংবাদ  

  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]