অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, চাই ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

দীর্ঘ এক স্বৈরশাসনের অবসানের পর বাংলাদেশের মানুষের মনে যে স্বস্তি, আশাবাদ ও মমত্ববোধ জন্ম নিয়েছিল, তা ছিল একেবারেই

2025-12-29T10:44:56+00:00
2025-12-29T10:44:56+00:00

অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, চাই ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:৪৪ এএম   (ভিজিট : ১৫৫)
দীর্ঘ এক স্বৈরশাসনের অবসানের পর বাংলাদেশের মানুষের মনে যে স্বস্তি, আশাবাদ ও মমত্ববোধ জন্ম নিয়েছিল, তা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। টানা প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন, ভোটাধিকারের প্রশ্নবিদ্ধতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নানা রকম অদৃশ্য চাপ-এসব মিলিয়ে দেশের মানুষ মানসিকভাবে এক গভীর ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বহু মানুষ রাস্তায় নেমেছে, প্রতিবাদ করেছে, তাজা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, কেউ কেউ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। এসব ত্যাগের বিনিময়ে যখন একটি স্বৈর সরকারের পতন ঘটল, তখন মানুষের প্রত্যাশা ছিল-এবার রাষ্ট্র একটি নতুন পথে হাঁটবে। কিন্ত বর্তমান প্রেক্ষাপট মানুষের মনে এক ধরনের হতাশার জন্ম দিচ্ছে,যা মোটেও কাম্য ছিল না। বাংলাদেশ একটি সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে। মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে; তরুণসহ বহু মানুষ চাকরি পাচ্ছে না; ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত; আর্থিক খাত শাসন ঘাটতির কারণে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে এবং বৈদেশিক চাপ অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে আরো প্রকট করছে। সামিটে এসব বিষয় খোলামেলা আলোচনা হয়েছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যাকে স্বীকার করা আর সমাধান বাস্তবায়ন করা-এ দুইয়ের মাঝে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান আছে। এ ব্যবধান কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য দরকার এমন নেতৃত্ব, যারা বলিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো গড়তে সক্ষম। ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি দিয়ে কখনই কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার সফল হয় না; বরং প্রতিষ্ঠান, নীতি, নিয়ন্ত্রক শক্তি ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাই একটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে। 

এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন নাগরিকদের একটি বিরল সুযোগ দিচ্ছে-একটি নতুন সামাজিক চুক্তির জন্মের। এ নতুন চুক্তি দাবি করে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে প্রচারণা হিসেবে নয়, বরং দায়বদ্ধ চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করবে। পাশাপশি প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে তাদের ভূমিকা পালন করবে; মিডিয়া, একাডেমিয়া ও সুশীল সমাজ জবাবদিহির ওপর অবিচল চাপ বজায় রাখবে; আর নাগরিকরা তাদের ভোটের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেবে যে তারা আর কেবল উচ্চকণ্ঠ প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, বরং বাস্তবায়নের যোগ্যতা ও সততা দেখতে চায়। কাজটি কঠিন হলেও পথটি অপরিহার্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আগের ধারা বজায় রাখার আর কোনো সুযোগ নেই। সবাই একযোগে স্বীকার করবেন বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা, কর-ব্যবস্থার অকার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রক জটিলতা, আর্থিক খাতে শাসন ঘাটতি, বেকারত্বের চাপ, মূল্যবৃদ্ধি এবং আয়ের ক্রমবর্ধমান অসমতা-সব মিলিয়ে অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।যদিও রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব সমস্যার সমাধান হিসেবে কারখানা পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি সম্প্রসারণ, দুর্নীতি দমন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এবং অনেক ক্ষেত্রে অতীতের গতানুগতিক নিয়ম ভাঙার সৎ ইচ্ছাও প্রকাশ করছেন। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের প্রকৃত সড়কবাঁক: কোন বাঁকের দিকে দেশ যাবে? দেশ এ ধরনের প্রতিশ্রুতির মহড়া আগেও শুনেছে-বিস্তারিত,আকর্ষণীয়, উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি এবং বছরের পর বছর নাগরিকরা প্রত্যক্ষ করেছেন এসব প্রতিশ্রুতির বেশ বড় অংশই নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রতারণার বাস্তবতার চক্রে বিবর্ণ হয়ে যায়। 

ফলে জনআস্থা ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে, আর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে। নাগরিকরা ভুলে যাননি যে নির্বাচনের সময় আশাজাগানো প্রতিশ্রুতি পরে বেদনায় পর্যবসিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা এবারো মানুষের মনে আছে এবং সেই অভিজ্ঞতাই হওয়া উচিত ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান নির্দেশনা। জাতি ভুলে যায়নি ১০ টাকা সেরের চাল খাওয়ানোর চকচকে প্রতিশ্রুতি অথবা গণতন্ত্র রক্ষার নামে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে কবর দেয়া। এ প্রেক্ষাপটে পরিষ্কার হয়ে গেছে বাংলাদেশ এখন শুধু প্রতিশ্রুতির উৎসব বা মহড়া চায় না, চায় বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিযোগিতা। রাজনৈতিক দল যে-ই হোক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা উপস্থাপনা সহজ; কিন্তু কতগুলো দল বা নেতৃত্ব বাস্তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও সততার পরিচয় দিতে প্রস্তুত এবং ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য নিজেরা আন্তরিকভাবে তৈরি এবং তার স্বাক্ষর রেখেছে- সেটাই আসল সমস্যা। আগত নির্বাচন তাই এমন এক বেঞ্চমার্ক দাবি করছে, যেখানে ভোটারদের চিন্তা করতে হবে প্রতিশ্রুতির সৌন্দর্য বা ডালি নয়, বরং এগুলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং সেই সঙ্গে সততা ও বিশ্বস্ততা। কোন দলগুলো প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে? জাতির প্রয়োজন এমন দল যেগুলোর নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে যে তারা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চাপে নীতি ও ন্যায়বোধ বিসর্জন দেয় না। কোন রাজনৈতিক দল অভ্যন্তরীণ দিক থেকে সুশৃঙ্খল, দলীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র চর্চা করে এবং নির্বাচনী বাণিজ্যের পঙ্কিলতায় অভিযুক্ত নয়? কিংবা তারা স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, জবাবদিহিমূলক আর্থিক শাসন ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ গণতন্ত্র গঠনে সত্যিকারের অঙ্গীকারবদ্ধ? 

কারা জাতিকে দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসন জাতিকে উপহার দেয়ার জন্য সাংগঠনিকভাবে তৈরি এবং জনগণের আস্থাভাজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ? এ প্রশ্নগুলোই সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগতভাবে এসব বিষয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্লোগান, সবচেয়ে জোরালো ম্যানিফেস্টো, সবচেয়ে আশাজাগানো প্রতিশ্রুতি দেয়া খুবই সহজ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর-কে কথা রেখেছে, কে প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করেছে, কে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বদলে নীতিকেন্দ্রিক শাসনকে প্রাধান্য দিয়েছে অথবা এগুলোর ব্যাপারে আস্থাভাজন অথবা মজবুত সম্ভাবনাময়। 

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু ভালো ধারণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা ও রুল-বেইজড গভর্ন্যান্সের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি। একটি দেশের কাঠামোগত সংস্কার তখনই সফল হয়, যখন নেতৃত্ব নৈতিকতা ধারণ এবং কথা ও কাজের মধ্যে সংগতি বজায় রাখতে পারে এবং বজায় রাখায় আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে; যখন প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে; যখন নীতি সিদ্ধান্তগুলো স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার বদলে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়। তাই নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের উচিত নজর রাখা শুধু কে কী বলছে তার ওপর নয়, বরং কে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তা বাস্তবে রূপ দিতে পারবে। যে দেশের আর্থিক, শিল্প ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে সবাই উপলব্ধি করছেন-এখন সামনে বড় বাস্তবতা ও কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। কিন্তু উপলব্ধি কেবল সূচনা, সংস্কার নয়। এ নির্বাচনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে, নাগরিকরা তাদের পছন্দ নির্ধারণে কতটা গুরুত্ব দেয় দক্ষতা ও সততাকে। প্রশ্ন আসলে একটাই-কারা কথা দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে দেখাতে সক্ষম।

এ প্রশ্নকেই ভোটারদের বিচার-বিবেচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত। কারণ রাজনৈতিক ভাষণ ও নির্বাচনী নাটক যতই আকর্ষণীয় হোক, একটি দেশের অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সততা, সক্ষমতা এবং দায়বদ্ধতার ওপর-যেসব গুণ ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক রূপান্তরই সম্ভব নয়।এ সড়কবাঁকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে,অতীতের পুনরাবৃত্তি চাই, নাকি ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ? যে দল এবং তাদের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীরা সত্যিকারের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবে, তাদের হাতেই রূপান্তরের চাবিকাঠি। তাই আগত নির্বাচনে প্রতিশ্রুতির কোলাহলের মধ্যেও ভোটারদের মনে থাকা উচিত একমাত্র মূল প্রশ্ন: কাদের হাতে জাতির নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন নিরাপদ? কে বা কারা জাতির স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হবেন? এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তরই দেশকে এগিয়ে নেবে একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে।ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এটা ঠিক। কিন্তু নির্বাচনের মধ্য দিয়েও স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতায় আসতে পারে বা ক্ষমতায় এসে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে এমন নজির পৃথিবীতে অনেক রয়েছে।সে কারণেই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি এবং চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য একদিকে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের স্বাধীনতা ও সমন্বয় অন্যদিকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সচেতনতা দরকার। অভ্যুত্থান দেখিয়েছে কীভাবে স্বৈরাচারী সরকার উৎখাত হয় এখন মানুষ দেখতে চায় কীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি একটা রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রূপে দাঁড় করাতে আরও কত কাজ আছে বাকি। সেদিকে নজর দেওয়া খুব জরুরি। এক বিপুল প্রত্যাশায় জনগণ নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষমতায় গিয়ে তারা যেন সেটা ভুলে না যান। মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়, ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি নয়।
 
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই









  সর্বশেষ সংবাদ  

  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]