জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। এর শুরু হয় ৭৫-পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় জিয়াউর রহমানের

2025-12-31T10:32:33+00:00
2025-12-31T10:32:33+00:00

জাতি একজন মহান অভিভাবককে হারালো
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:৩২ এএম   (ভিজিট : ২৫২)
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। এর শুরু হয় ৭৫-পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের আবির্ভাবের মাধ্যমে। বিশেষ করে দেশ পুনর্গঠন এবং দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে একটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীকে একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার পতাকাতলে নিয়ে এসে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তিনি দেশের মানুষকে দেখাতে পেরেছিলেন।জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সাহসিকতা এবং জেমস বার্নসের রূপান্তরমূলক নেতৃত্বের ধারণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, যা জিয়াউর রহমানকে একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেও তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয় আমাদের দেশ। বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অধ্যায়ের অবসান হলো ৩০ ডিসেম্বর। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেন, অনন্তের পথে। গণতন্ত্রের এক আপসহীন নেত্রী, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একজন সাহসী নির্মাতা, নিপীড়িত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।বেগম জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীক। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তিনি দেশনেত্রী। দলমত নির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত একজন মহান ব্যক্তিত্ব। তার চলে যাওয়ায় এ দেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। বাংলাদেশের মানুষ হারাল একজন বিশ্বস্ত অভিভাবক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল অনন্য। চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশ ও জনগণের জন্য তাঁর সংগ্রাম, সাহস ও ধৈর্য আমাদের জন্য জীবন্ত শিক্ষা হয়ে থাকবে। 

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর কথা এখনও আমাদের মনোবল, সংকল্প ও দেশপ্রেমের দিকনির্দেশনা দেবে। ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বলেছিলেন, 'দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এটাই আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মানুষই আমার সবকিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাব না। এ কথায় বোঝা যায়, তার জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশের মানুষ ও দেশ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বিএনপির সভায় যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, 'আপনাদের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে আরও উজ্জীবিত হয়ে আগামী নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এমন কাজ করবেন না যাতে এতদিনের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ বৃথা যায়। মনে রাখুন-‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়' এই উক্তিতে দেশের জন্য দায়িত্বশীলতা এবং দলের প্রতি আনুগত্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। গত বছর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। ৭ আগস্ট নয়াপল্টনের বিএনপির সমাবেশে তিনি বলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’ গত বছর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়ার পর ৭ আগস্ট নয়াপল্টনের বিএনপির সমাবেশে তিনি বলেন,'ধ্বংস নয়,প্রতিশোধ নয়,প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’ এই বক্তব্যে দেখা যায়, ব্যক্তিগত ক্ষতি বা প্রতিশোধের চেয়ে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধিকে তিনি সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন।২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আরও একবার নিজের অন্তরের অনুভূতি প্রকাশ করেন, 'আমার এই স্বজনহীন জীবনেও দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকবো, দেশবাসীকে ছেড়ে যাবো না।' এ কথায় তার অকৃত্রিম দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা স্পষ্ট। 

১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৩ সালে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নামেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭-দলীয় ঐক্যজোট। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মূলত তাঁর নেতৃত্বের কারণে এরশাদের পতন সম্ভব হয়। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত হন। খালেদা জিয়ার বক্তব্যের মূল ভাবনা ছিল জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস, গণতন্ত্রের প্রতি অটল সংকল্প এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগ। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি শুধুমাত্র জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সম্ভব। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব তাঁর কথায় সবসময় প্রতিফলিত হয়েছে। আজ তার প্রয়াণে আমরা শোকাহত, কিন্তু তাঁর জীবন ও বক্তব্য আমাদের সাহস, ধৈর্য এবং সংগ্রামের অনুপ্রেরণা জোগাবে। খালেদা জিয়ার দৃষ্টান্ত মনে করিয়ে দেয়, দেশের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বড় নয় এবং দেশের জন্য দায়বদ্ধ হয়ে কাজ করাই সত্যিকারের নৈতিক দায়িত্ব। যেকোনো গণতন্ত্রের সংগ্রামে তিনিই হবেন আন্দোলনরত মানুষের অনুকরণীয়। আবারও যদি বাংলাদেশ স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে, তাহলে সেখান থেকে মুক্তির পথে বেগম জিয়াই হবেন আলোর দিশারি। এদেশের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে থাকবেন তিনি অনন্তকাল। নির্যাতিত মানুষ তার কাছেই ফিরে যাবে সংগ্রামের দীক্ষা নিতে। বেগম জিয়া তার জীবনে যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা থেকে শিক্ষা নেবে প্রতিটি মানুষ। বেগম জিয়ার জীবন ও দর্শন যেকোনো মানুষকে বিকশিত করবে, উৎসাহিত করবে।বেগম জিয়ার ৮০ বছরের জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বেগম জিয়া একজন আদর্শ সহধর্মিণী, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে উৎসর্গ করেছিলেন। 

দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে তিনি দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে অন্যরকম যুদ্ধ করেছেন। বিজয়ের পর নীরবে নিভৃতে তিনি তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর পাশে থেকেছেন, সহযোগিতা করেছেন।দেশের জন্য জিয়াউর রহমান শহীদ হলে বেগম জিয়া তার স্বামীর আদর্শকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আরও বেশি জনপ্রিয় করেছেন তিনি শহীদ জিয়ার আদর্শ। বেগম জিয়া একজন আদর্শ মা, যিনি তার দুই সন্তানকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বেগম জিয়া একজন মানবিক মানুষ, যিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। বেগম জিয়া বাংলাদেশে নারী মুক্তির একজন পথপ্রদর্শক। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নারী শিক্ষা বিকশিত হয়েছে। তিনিই নারী শিক্ষা অবৈতনিক করেন। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। বেগম জিয়া শিশু অধিকারের একজন মহান নেতা। তিনি শিশুদের জন্য শিক্ষা অবৈতনিক করেন। শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করেন। বেগম জিয়া একজন জনদরদী কৃষকবান্ধব নেত্রী। তিনি কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করেছেন। কৃষি ঋণ প্রবর্তন করেন। বাংলাদেশে শিল্পায়নে বেগম জিয়ার অবদান কেউ কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবে না। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে তার পদক্ষেপ অনুসরণ করলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে। শুধু তাই নয়, বেগম জিয়া একজন সফল কূটনীতিক। বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সারাবিশ্বে তিনি সম্মানিত হয়েছেন, বাংলাদেশকে করেছেন সম্মানিত। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব-এই নীতিতে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বেগম জিয়া একজন অনুকরণীয়, অসাধারণ রাজনীতিবিদ। আশির দশক থেকে এখন পর্যন্ত তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেত্রী।তিনি বাংলাদেশে আদর্শবান রাজনীতিবিদদের জন্য উদাহরণ। 

রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো আদর্শের সঙ্গে আপোস করেননি। নিজের আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে তা বাস্তবায়নের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের জন্যই শুধু নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও তিনি প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। আদর্শের লড়াইয়ে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। সীমাহীন অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু তাতে দমে যাননি। হাল ছাড়েননি, পিছপা হননি। লক্ষ্যে অটল থেকে লড়াই করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন তিনিই। রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পরিচয় দিয়েছেন বেগম জিয়া। কখনো প্রতিপক্ষকে নোংরা বা কদর্য ভাষায় আক্রমণ করেননি। রাজনৈতিক শালীনতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অশ্লীল ভাষা ও কুরুচির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন নীরব প্রতিবাদ। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, তরুণ প্রজন্ম হারাল একজন পথপ্রদর্শক। নারীরা হারাল তাদের প্রেরণা ও ভালোবাসার প্রিয় মানুষকে। নিপীড়িত মানুষ হারাল তাদের সংগ্রামের সাহসকে। এ দেশের দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি চলে গেলেন। সব মত ও পথের মানুষকে কাঁদিয়ে তিনি চিরবিদায় নিলেন। বাংলাদেশে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে তিনি বিদায় নিলেন। তবে আমি মনে করি, বেগম জিয়ার মৃত্যু নেই, তিনি অমর। কিন্তু বেগম জিয়া বেঁচে থাকবেন তার কাজের মাধ্যমে, তার আদর্শের জন্য। বেগম জিয়ার আদর্শের মৃত্যু হবে না কোনোদিন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বেগম খালেদা জিয়া বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে। তার কর্মজীবনে অনুপ্রাণিত হবে কোটি মানুষ। তার ত্যাগ স্মরণ করবে বাংলাদেশের জনগণ। প্রতিটি নারী, প্রতিটি শিশু তাকে সম্মান করবে, সবসময়। কারণ তিনি নারী ও শিশুদের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করে গেছেন চিরকাল। বেগম জিয়ার সংগ্রামের ইতিহাস এদেশের মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল।বাংলাদেশের ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এক সাহসী ও আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। এই শোক শুধু একটি দলের নয়, এই শোক রাষ্ট্রের, এই শোক আমাদের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই









  সর্বশেষ সংবাদ  

  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]