
একটি সুন্দর ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার জন্য আজকে আমরা দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করেছি, বাংলাদেশ নতুনভাবে স্বাধীন হয়েছে। সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ একটি সুন্দর সমাজ ও একটি সুন্দর সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। যেখানে কোনো অপচেষ্টা, অপরাজনীতি ও বিশৃঙ্খলা থাকবে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল একজন নেতার উত্থান বা একটি দলের বিজয়ের গল্প নয়। এটি আরও গভীর কিছু। এটি জনগণের সম্মিলিত ঘোষণা-উগ্রতা আমাদের পরিচয় নয়; ভয় আমাদের শাসক নয়। আর ধর্মীয় গোঁড়ামি আমাদের বহুবর্ণ উত্তরাধিকারকে সংকুচিত করতে পারবে না। এটি প্রমাণ করে-বাংলাদেশ এখনও বহুত্ববাদ, সাহস ও বিবেকের ওপর বিশ্বাস রাখে। অনেক বছর মানুষ মনে করেছিল, ভোট যেন একটি আনুষ্ঠানিকতা-ফলাফল পূর্বনির্ধারিত, অংশগ্রহণ অর্থহীন। কিন্তু এবার মানুষ ঘর থেকে বেরিয়েছে। লাইনে দাঁড়িয়েছে। ভোট দিয়েছে। এই একটি মাত্র দৃশ্যই আশার ভাষা। এটি প্রমাণ করে যে, জনগণ আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে- তাদের কণ্ঠস্বরের মূল্য আছে। নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়; দায়িত্বও। এখন প্রয়োজন কেবল প্রশাসন নয়; রূপান্তর। অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, লুটপাট, জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করার মানসিকতা-সেই অধ্যায়ে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। অতীতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো- উভয়েই এই দেশের প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে; মানুষের আস্থাকে ক্ষয় করেছে; স্বজন প্রীতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। সামনে এগোতে হলে আমাদের সৎ আত্মসমালোচনা দরকার। কিন্তু জবাবদিহিই শেষ কথা নয়।প্রশ্নটি আরও বড়-আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?কঠিন অর্থনৈতিক ও জননিরাপত্তা সংকটের সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোট এখন ক্ষমতায়।
বিগত আওয়ামী সরকারের জঞ্জাল এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে না পারার ধকল এখন তারেক রহমান সরকারের কাঁধে এসে পড়েছে। তাই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিন হবে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই লড়াইয়ে মূলভিত্তি হওয়া চাই সহনশীলতা নীতি। অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস ইত্যাদি দমন করে সবার মধ্যে আস্থা ফেরানো ও নিরাপত্তা জোরদার করা। এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। অর্থনীতির চাকা সচল করতে প্রথমেই বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা ফেরানো জরুরি। উচ্চ সুদের হার বর্তমানে ব্যবসার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সঙ্গে নিয়ে সরকারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ সচল রাখা যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত রক্ষায় বিশেষ প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না করলে তৃণমূল পর্যায়ে বেকারত্ব কমানো সম্ভব নয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টেকসই করা সহজ হবে।রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় করব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। হয়রানিমুক্ত কর আদায় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে করের আওতা বাড়ানো উচিত, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত চুক্তি এবং শক্তিশালী লবিং শুরু করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এটি কেবল তহবিলের সংস্থান করবে না, বরং দুর্নীতিবাজদের প্রতি কঠোর বার্তা দেবে।
আমদানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশকে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কের আওতায় এনে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে, যা পরোক্ষভাবে ডলার সংকট কাটাতে সাহায্য করবে। আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারই টেকসই হবে না। মব কালচার বা গণপিটুনি এবং বিনা বিচারে হয়রানির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। জনমনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি শিল্পাঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। মানুষ যখন দেখবে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হয়েছে এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, তখনই স্থবির হয়ে পড়া ঘরোয়া বিনিয়োগ চাঙ্গা হবে। রপ্তানি ঝুড়িতে কেবল পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে তথ্য-প্রযুক্তি ও চামড়াশিল্পের মতো খাতগুলোতে বিশেষ ছাড় দিয়ে বাজার বহুমুখী করতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙার পাশাপাশি সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন থেকে চাঁদাবাজি নির্মূল করা গেলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আসবে।ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা হলো আস্থার সংকট এবং খেলাপি ঋণের পাহাড়। এই সংকট নিরসনে প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা জরুরি, যা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই বড় বড় খেলাপিকে চিহ্নিত করবে এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কেবল টাকা ছাপিয়ে সহায়তা না করে বরং আন্ত ব্যাংক লেনদেন চাঙ্গা করা এবং আমানতকারীদের মনে এই বিশ্বাস ফেরানো দরকার যে তাঁদের টাকা নিরাপদ। উচ্চ সুদের হার ব্যবসার জন্য শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই উৎপাদনশীল খাতের জন্য বিশেষ সুদের হার নির্দিষ্ট করে দিয়ে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করতে হুন্ডি বন্ধে প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স প্রেরণে বিশেষ প্রিমিয়াম ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। কাঁচামাল আমদানির এলসি খুলতে না পারা এবং জ্বালানিসংকটের কারণে অনেক কারখানা বন্ধের মুখে। নতুন সরকারের উচিত হবে জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পাঞ্চলগুলোতে লোডশেডিং শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। বিশেষ করে সাভার, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকাগুলোতে মব সন্ত্রাস বা অস্থিরতা বন্ধে একটি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাস্কফোর্স’ গঠন করা উচিত, যেখানে শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সরাসরি সমন্বয় থাকবে। দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফলে রাজনীতি-আমলাতন্ত্র এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা বিএনপি সরকারের জন্য হবে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। গত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা যদি শক্ত হাতে দমন করা না যায়, তবে কোনো বিনিয়োগকারীই নিরাপদ বোধ করবেন না। শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে তৃতীয় কোনো পক্ষ যদি অস্থিতিশীলতা তৈরি করে, তবে রপ্তানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া বিগত সরকারের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যারা এখনো প্রশাসনের ভেতরে বা বাইরে সক্রিয়, তারা অর্থনৈতিক সংস্কারে স্যাবোটাজ তৈরির চেষ্টা করতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটগুলো যদি তাদের সরবরাহ চেইন ধরে রাখে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তবে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ নতুন সরকারের জনপ্রিয়তাকে দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন সরকারকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিরোধী মত বা সুধীসমাজকে আস্থায় নেওয়া হবে একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল। নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো জন-আকাঙ্ক্ষাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোতে রূপ দেওয়া। উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপি বা সেতু নয়। উন্নয়ন মানে শ্বাসযোগ্য বাতাস, পানযোগ্য জল, সবুজ উন্মুক্ত স্থান, সাংস্কৃতিক সহাবস্থান, জবাবদিহিমূলক শাসন। উন্নয়ন মানে শিশুরা গাছের ছায়ায় খেলবে। শিল্পীরা নির্ভয়ে সৃষ্টি করবে। ধর্মীয় নেতারা নিয়ন্ত্রণ নয়; করুণা শেখাবেন। বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখাতে পারে-জনবহুল মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ হয়েও পরিবেশে অগ্রণী; আধ্যাত্মিকতায় উদার; সংস্কৃতিতে প্রাণবন্ত; রাজনীতিতে জবাবদিহিমূলক হওয়া সম্ভব। ভাতে মাছে সন্তুষ্ট বাঙালিরও এককালে গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছ ছিল। এখনো যে নেই এমন নয়। তবে তা দেশের জনগোষ্ঠীর তুলনায় অপ্রতুল। কিন্তু জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আমরা এও জেনেছি, আর শিখছি প্রতিদিন নতুন করে, আমাদের এই সীমিত ভূখণ্ডের আকাশে, বাতাসে, পাতালে, সমুদ্রে, জলে-স্থলে যে সম্পদ সঞ্চিত আছে, তা অফুরন্ত। তার উপর আমাদের সার্বভৌম দখল প্রতিষ্ঠা করে আমরা যদি বিশ্বমানবের কল্যাণে তাকে পর্যায়ক্রমে কাজে লাগাতে পারি, আমরা যদি অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুযোগ নিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে পারি, বাংলাদেশ তার অতীতলীন কিংবদন্তী পুনরুদ্ধার করে একটি প্রাগ্রসর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ তার মানবমেধা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে একবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই বিশ্বের একটি সচ্ছল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হোক। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশ যেন বিশ্বমানবের কল্যাণে তার সাহায্যে হাত সম্প্রসারিত করতে পারে।আধিপত্যবাদ নয়, সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানই হোক আমাদের বেড়ে-ওঠার সুশীল মন্ত্র।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই