
মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মহাকাশ মানুষের প্রবল কৌতূহলের বিষয়। মানুষের সেই বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, জ্ঞানলিপ্সা এবং অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা থেকেই মহাকাশ অভিযানের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই যাত্রা কেবল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পরিণত হয়েছে শক্তির রাজনীতি, প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক জটিল প্রতিযোগিতায়।
বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে শুরু করে চাঁদ, মঙ্গল এবং গভীর মহাকাশ সবখানেই আজ বড় বড় শক্তিধর দেশগুলোর আধিপত্য ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মূলত মহাকাশ হয়ে উঠেছে নতুন ভূরাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আর্টেমিস অ্যাকর্ডস এবং চীন-রাশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন এই দুই জোটের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তা বিজ্ঞানের নামে নয়, বরং চাঁদের সম্পদ, কক্ষপথের নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব-প্রভাবের লড়াই। এই প্রতিযোগিতা কেবল বড় দেশগুলোকে শক্তিশালীই করছে না। বরং ছোট দেশগুলোকে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এ সকল দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং পুরো বিশ্বকে বাধ্য করছে বড় শক্তির সামনে মাথা নত করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই মহাকাশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের বীজ বপন করা হয়েছিল। আর বর্তমান সময়ে সেই বপিত বীজই মহিরুহ বৃক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।সেখানে যে দেশ মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সে দেশ পুরো পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন এবং ড্রোন হামলার মূল চাবিকাঠি এখন মহাকাশেই। ফলে, বিজ্ঞানের উন্নতির দোহাই দিয়ে যে স্যাটেলাইটগুলো উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে, তার অধিকাংশই মূলত প্রতিপক্ষের ওপর নজরদারি এবং যুদ্ধের সময় নিখুঁতভাবে আক্রমণ করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মহাকাশ প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামরিক ব্যবহার।
বর্তমানে বিভিন্ন দেশ মহাকাশে অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি এবং পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছে। ২০০৭ সালে চীন একটি অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইল পরীক্ষা করে নিজস্ব উপগ্রহ ধ্বংস করে। ২০১৯ সালে ভারতও একই ধরনের পরীক্ষা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করছে।
মহাকাশে এই সামরিক প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যেও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ উপগ্রহ ধ্বংস হলে তা হাজার হাজার ধ্বংসাবশেষ তৈরি করে, এই ধ্বংসাবশেষ কক্ষপথে শতাব্দী ধরে থাকবে এবং কেসলার সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়াবে। যেখানে একটি সংঘর্ষ অন্য সংঘর্ষ ঘটিয়ে পুরো কক্ষপথ অকেজো করে দিতে পারে। এই ধ্বংসাবশেষের অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিপুল। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো প্রতিকার ছাড়া এটা বিশ্ব জিডিপির ১.৯৫% ক্ষতি করতে পারে দীর্ঘমেয়াদে। এছাড়া মহাকাশ অর্থনীতি এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল খাতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতির মূল্য ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে এটি এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। এক্ষেত্রে চাঁদে হিলিয়াম-৩, গ্রহাণুতে বিরল ধাতু এবং মহাকাশ পর্যটনের মতো সম্ভাবনাগুলো বড় শক্তিধর দেশগুলোকে আকর্ষিত করেছে। এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে উন্নয়নশীল এবং ছোট দেশগুলো। মহাকাশ গবেষণার জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা যোগাতে গিয়ে ছোট দেশগুলোর অর্থনীতি হিমশিম খাচ্ছে। পাশাপাশি যেহেতু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দেওয়া এসকল দেশের জন্য কষ্টসাধ্য তাই ছোট দেশগুলো যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবহাওয়ার তথ্য কিংবা নেভিগেশন সেবার জন্য বড় শক্তিধর দেশগুলোর প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরছে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে এক নতুন ধরনের মহাকাশ উপনিবেশবাদ।
এই নির্ভরতা কেবল আর্থিক নয়, বরং তথ্যগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো মহাকাশ প্রতিযোগিতার নামে দেশগুলো যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তা দিয়ে পৃথিবীর দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল। অথচ কেবল আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে সামরিক স্যাটেলাইটের পেছনে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে যাচ্ছে। অস্ত্রের প্রতিযোগিতার কারণে অনেক দেশ তাদের বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় করছে মহাকাশ প্রযুক্তিতে, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, মহাকাশে ক্রমবর্ধমান এই প্রতিযোগিতার কারণে তৈরি হচ্ছে মহাকাশ আবর্জনা বা স্পেস জাঙ্ক। হাজার হাজার অকেজো স্যাটেলাইট এবং রকেটের ধ্বংসাবশেষ কক্ষপথে ঘণ্টায় হাজার হাজার মাইল বেগে ঘুরছে। এগুলো কেবল বর্তমানের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও মহাকাশ ভ্রমণের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারে। এই পরিবেশগত ক্ষতির দিকে কারো খেয়াল নেই, সবাই ব্যস্ত কেবল ক্ষমতার প্রদর্শনে। যা খুবই হতাশাজনক। সঙ্গত কারণেই এই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মহাকাশ-মহাকাশ খেলার অঙ্গন থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের সংস্কার অতীব জরুরি। সেই লক্ষ্যে সকল দেশের সমন্বয়ে মহাকাশকে সামরিকীকরণমুক্ত করতে একটি কঠোর এবং বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মহাকাশ প্রযুক্তি যেন কেবল কয়েকটি দেশের কুক্ষিগত না থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং নীতি নির্ধারণীর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি মহাকাশ মিশনের উদ্দেশ্য এবং কারিগরি তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে বিজ্ঞানের আড়ালে সামরিক হামলার ছক কোন রাষ্ট্র তৈরি করতে না পারে।
জাতিসংঘের অধীনে একটি বৈশ্বিক তহবিল গঠন করা যেতে পারে যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মহাকাশ গবেষণায় সহায়তা করবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি মহাকাশ যেন শুধু বড় শক্তির হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, বরং মানবজাতির যৌথ অগ্রগতির সেতু হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিজ্ঞানকে ভূরাজনীতি নয়, সহযোগিতার পথে ব্যবহার করতে হবে। তবেই মহাকাশ নামক এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি জ্ঞান অর্জন এবং গবেষণায় ব্যবহৃত হবে, ধ্বংসের কাজে নাই। তাতেই পুরো বিশ্বের উন্নতি এবং সমৃদ্ধি লাভ সম্ভব।
লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
ডেল্টা টাইমস্/প্রজ্ঞা দাস/আইইউ