বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো পানি ব্যবস্থা

পনা। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘খাল খনন কর্মসূচি’র মাধ্যমে যে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, তা ছিল স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার এক কালজয়ী মাইলফলক। সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে এবং আধুনিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার আগামী ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখ থেকে দেশব্যাপী এক বিশাল খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে।
আগামী ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করবেন। এই উদ্যোগের আওতায় আগামী ৫ বছরে সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রথম ১৮০ দিনে ১,০০০ কিলোমিটারের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কাজের গতিশীলতায় প্রকৃতপক্ষে ১,২০০ কিলোমিটারের বেশি কাজ দৃশ্যমান হবে।
শহীদ জিয়ার খাল খনন কেবল একটি প্রকৌশলগত কাজ ছিল না, এটি ছিল একটি সামাজিক আন্দোলন। কোদাল হাতে রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই মাঠে নেমেছিলেন, যা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কয়েক হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও সংস্কারের ফলে আবাদি জমির পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের পথ সুগম হওয়ায় অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা পায়। বর্তমান বিএনপি সরকারের উন্নয়ন দর্শনের মূলে রয়েছে কৃষি ও কৃষকের মুক্তি। কেন আজ নতুন করে এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে? ক্রমাগত গভীর নলকূপ ব্যবহারের ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। খাল খননের মাধ্যমে ভূ-পরিস্থ পানির (Surface Water) ব্যবহার বাড়ানোই এখন সময়ের দাবি। পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী ও শাখা খালগুলো সচল করা এবং খরা ও অসময়ে বৃষ্টিপাতের প্রভাব কমাতে জলাধার হিসেবে খাল অত্যন্ত কার্যকর।
স্বনির্ভরতার পথে বাংলাদেশ। খাল খনন কর্মসূচি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লব ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর। খাল খননের ফলে সেচ সুবিধা প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। সেচ সংকটের কারণে অনেক জমি বছরের বড়ো একটা সময় পড়ে থাকে। খালের পানি ব্যবহার করে শীতকালীন সবজি ও বোরো চাষে আমূল পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে দ্বি-ফসলি জমিগুলোকে ত্রি-ফসলিতে রূপান্তর করা সহজ হবে। পাশাপাশি কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বিদ্যুৎচালিত পাম্পের চেয়ে খালের পানি দিয়ে সেচ দেওয়া অনেক সাশ্রয়ী, যা কৃষকের মুনাফা বাড়াবে। খালগুলো কেবল সেচের উৎস নয়, এগুলো উন্মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য চাষের প্রধান কেন্দ্র। খালগুলো পুনঃখনন করলে বর্ষা মৌসুমে সেখানে দেশি প্রজাতির মাছের অভয়াশ্রম তৈরি হবে। শিক্ষিত যুবকেরা খালের পাড়ে খাঁচায় মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
খাল খনন কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও দেশে বনায়নের হার বৃদ্ধিতে পরিকল্পিতভাবে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ অতিরিক্ত অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হবে। পরিকল্পিত বনায়ন গড়ে তোলা হলে একদিকে গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখবে, ফলে খালের পাড় ভেঙে যাওয়া ও পাহাড় ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির রিচার্জ (Groundwater Recharge) এর মাধ্যমে জানা যাবে অতিরিক্ত সেচ কাজের ফলে মাটির নিচের পানির স্তর শূন্য হয়ে যাচ্ছে। খালগুলোতে সারা বছর পানি জমে থাকলে তা চুইয়ে চুইয়ে মাটির নিচে যায়। একে ‘ন্যাচারাল রিচার্জ’ বলা হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধ করবে।
গ্রামের অভ্যন্তরে ছোট ছোট খালগুলো একসময় নৌ-যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল। এগুলো সচল করলে স্বল্প খরচে কৃষিপণ্য হাট-বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং গ্রামীণ অবকাঠামো শক্তিশালী হবে। গ্রামের পুরোনো খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করে সেখানে খালের পাড়ে ঘাস চাষ এবং খালের পানি ব্যবহার করে হাঁস পালন ও গবাদি পশুর গোসল ও পানীয় জলের সংস্থান করা সম্ভব হবে। এটি দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই খাল খনন কর্মসূচি কেবল উৎপাদন বাড়াবে না, এটি গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় বড়ো ধরনের পরিবর্তন আনবে।
খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়লে গ্রামীণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা সামগ্রিক জাতীয় প্রবৃদ্ধি (GDP) বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। খালের পাড়ে বনায়ন ও হাঁস-মুরগি পালনে গ্রামীণ নারীরা সরাসরি যুক্ত হতে পারবে। যেকোনো বড়ো কর্মসূচির মতো খাল খনন কর্মসূচিরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সঠিক পরিকল্পনায় তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিশেষ করে খালের জমি দখলদারিত্ব খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করাও একটি চ্যালেঞ্জ। কঠোরভাবে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে খালের জমি দখলদারিত্ব মুক্ত করতে হবে। খাল খননের পর পলি জমে যাতে আবার তা ভরাট না হয়, সেজন্য নিয়মিত তদারকি করতে হবে। তবে আশার কথা হলো এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে ইতিমত্যেই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, খালের জমি উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণে কোনো প্রকার অনিয়ম সহ্য করা হবে না। পলি জমে যেন খাল পুনরায় ভরাট না হয়, সেজন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ছিল একটি দূরদর্শী স্বপ্ন। বর্তমান বিএনপি সরকার সেই স্বপ্নকে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আবার জাগিয়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাংলাদেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। পানিই জীবন, আর সেই পানির সঠিক ব্যবস্থাপনাই হলো সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। যদি এই কর্মসূচি সততা ও নিষ্ঠার সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়িয়ে বিদেশে কৃষি ও মৎস্য পণ্য রপ্তানি করার সক্ষমতা অর্জন করবে। একটি সবুজ, শ্যামল ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে খাল খনন কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই। এটি কেবল একটি খাল খনন নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি।
লেখক: তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা।
ডেল্টা টাইমস্/মো. রেজুয়ান খান/আইইউ