
সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন; যেখানে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। অথচ এই নির্বাচন নিয়ে সংশয়বাদীদের নৈর্ব্যক্তিক প্রচারণার অন্ত ছিল না। ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট নির্বাচন দিতে ইচ্ছুক না বা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবে না, এমন আশঙ্কার কথা প্রতিনিয়ত শোনা যেত। অথচ সব রকম অপপ্রচার ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হলো। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার গণতন্ত্রের যে যাত্রাটি বিপথগামি করে ফেলেছিল, সেটি আবার ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তাঁর উপদেষ্টা পরিষদ, সেনাবাহিনী ও জনপ্রশাসনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় লাইনে উঠে যেতে সক্ষম হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল অনুযায়ী দেশের বড় রাজনৈতিক দল, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সংগ্রাম করা, নির্যাতিত, নিপীড়িত দল বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেন। আর বিএনপির এই বিজয় যেন গোটা বাংলাদেশের বিজয়। মানুষ যেন এক বদ্ধ অবস্থা পার করে স্বস্তির নিশ্বাস নিচ্ছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে এই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তারাও ভালো ফল করেছে। এ ছাড়া ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে সম্মুখসারির নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের দল এনসিপিও ভালো করেছে। ছয়জন বিজয়ী তরুণ রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি নিয়ে সংসদে যাচ্ছেন, যা সংস্কারপ্রত্যাশী তরুণদের জন্য খুবই আশাপ্রদ একটি বিষয়। বিএনপি যদিও রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি অভিজ্ঞ দল, তবু এবার তাদের চ্যালেঞ্জ বিগত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি; যা মোকাবিলা করে সরকার পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশেষ এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আয়োজিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১২ ই মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ পথচলা শুরু করেছে। নানা কারণেই এবারের সংসদ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ২৪-এর আগে গত তিনটি সংসদের কার্যক্রমের কারণে সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অনেকাংশেই কমতে শুরু করেছিল।
তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে মানুষের মনে রাজনৈতিক কার্যক্রম ঘিরে প্রত্যাশা বেড়েছে। নতুন সংসদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, অতীতের মতো কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে না বরং সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্রচর্চার প্রাণবন্ত কেন্দ্র হয়ে উঠবে। সংসদে গঠনমূলক বিতর্ক, অর্থবহ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি যেমন গুরুত্ব পাবে তেমনি মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে দেয়া হবে বাড়তি গুরুত্ব। রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল জনসমর্থন নিয়ে গঠিত হওয়া সংসদের কার্যক্রম দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পুনর্জন্ম নিশ্চিত করবে, এমনটিই সবার প্রত্যাশা। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আর এ উন্নয়নের প্রধান শর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর আইনসভা। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দরুন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নানাভাবে দুর্বল হয়েছে। সে দুর্বলতা দূর করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সংসদের ভূমিকা অপরিসীম। প্রথম অধিবেশন সম্পন্ন হওয়ার আগে সংসদ সদস্যদের তরফে যে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছিল, তার প্রতিফলনও দেখা গেছে অধিবেশনের আনুষ্ঠানিকতায়। ঘন ঘন সংসদ বর্জন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের একটি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। অতীতের সংসদের স্থবিরতা ও ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্য একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনা করার মাধ্যমে জাতীয় অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এজন্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে গঠনমূলক আলোচনা, যৌক্তিক তর্ক ও সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ জরুরি। সংসদকে কার্যকর করতে এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে প্রতিটি বিলের ওপর যথাযথ যাচাই-বাছাই ও বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। যেকোনো বিষয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু মতভেদের বিতর্ক যেন আদর্শিক না হয়।
এ মতভেদ যেন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের হয়-এমনটিই কাঙ্ক্ষিত। ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং অন্য সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। সবার বক্তব্যেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। প্রথম অধিবেশনে সংসদীয় নেতা তারেক রহমান এবং অন্যান্য নেতার বক্তব্যে যে লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে সেগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে অবশেষে সংসদ বর্জন সংস্কৃতি, বিরোধীদলীয় নেতাদের অনুপস্থিতি এবং অসংসদীয় ভাষা ব্যবহারের অবসান ঘটবে, এমন প্রত্যাশাও নতুন করে দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো সংসদকে গঠনমূলক করার ইঙ্গিত দিয়েছে। আইন প্রণয়ন সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া সত্ত্বেও অতীতে সংসদ সদস্যরা প্রায়ই এ বিষয়ে সীমিত আগ্রহ দেখিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে অর্থবহ সংসদীয় আলোচনায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা জ্ঞানের অভাবও দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থার ওপর যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, তা দূর করার এটিই বড় সুযোগ। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে সক্রিয় করার মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব। দীর্ঘ সময় পর সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি আলোচনার নতুন জায়গা তৈরি করেছে। সংসদকে কেবল সরকারি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের রাবার স্ট্যাম্প না বানিয়ে বিতর্ক ও আলোচনার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে আগামীতে কাজে লাগানোর জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয় জরুরি। এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এ সংসদের বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সংসদের সদস্যরা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যে আকাঙ্ক্ষা থেকে এ নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন সংসদে দেখা যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
কেবল সংখ্যার জোরে নয়, যুক্তির জোরে সমৃদ্ধ হোক আমাদের আইনসভা।প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তনগুলো এ সংসদের মাধ্যমেই এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সরকারি পক্ষ থেকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংসদ পরিচালনা করার একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ সবই আমাদের গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। দেশের মানুষ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বাচনের সময় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে আলোচনা চলমান রাখতে হবে। সংসদে জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উঠে আসা তরুণ রাজনীতিকদের অংশগ্রহণও সংসদীয় কার্যক্রমে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করেছে। প্রাণবন্ত সংসদ গঠনে তাদের ভূমিকার দিকেও সবার মনোযোগ থাকবে। তাই প্রতিটি সংসদ সদস্যকে বক্তব্য উপস্থাপনে পেশাদারত্বের পরিচয় দেখাতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এক্ষেত্রে জবাবদিহি ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে জননিরাপত্তা ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার মতো জনহিতকর সিদ্ধান্তেও। সংসদ সদস্যদের অনুধাবন করতে হবে, আইন প্রণয়নে তাড়াহুড়ো না করে পর্যাপ্ত আলোচনা-সমঝোতা করতে হবে। এক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিগুলো শক্তিশালী করতে হবে। সংসদীয় কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-দুর্নীতি, সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে যথাযথ আলোচনা করতে হবে। সরকারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার জন্য জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার নীতি আলোচনা বাড়াতে হবে।জুলাই অভ্যুত্থানের পর বহুল প্রত্যাশিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে এবার যে সংসদ যাত্রা শুরু করেছে, তা নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিলে নীতিনির্ধারণের সুফল পাওয়া কঠিন কিছু হবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদকে সুস্থ তর্কের ক্ষেত্র গড়ে তোলার যে আশ্বাস দিয়েছেন, তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিতে সব পক্ষকেই কাজ করতে হবে। নতুন সংসদের এ পথচলা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে পারে। তবে তা যেন কোনো অংশেই জাতীয় স্বার্থের বিরোধী না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে। বিজয়ী দলই সব ধরনের ক্ষমতার চর্চা করবে, এমন যেন না হয়। সব ক্ষেত্রে দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। অতীতে যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে তখন প্রশাসন, পুলিশসহ সব রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সংস্থায় নিজেদের লোক বসিয়ে দিয়েছে। মানুষ এটা আর দেখতে চায় না। অনেক কষ্টে অর্জিত গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব যারা দেশ পরিচালনা করবেন, তাদেরই। রাষ্ট্রক্ষমতা যেন দলীয় নেতাকর্মীদের টাকা কামানোর উৎস হয়ে না ওঠে। ক্ষমতার রাজনীতি যেন আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত না হয়। এবং অবশেষে বলতে হয়, স্ট্রাকচারাল এই রাষ্ট্র ভেঙে পড়েছিল আওয়ামী দুঃশাসনের কারণে। আওয়ামী লীগের গত দেড় দশকের অপশাসন, লুণ্ঠন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রকে হত্যা করার যে দৃষ্টান্ত বিএনপির সামনে রয়েছে, বিএনপি তা যেন অনুসরণ না করে। বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের যে অভিযোগ রয়েছে; এবারের নির্বাচনের প্রচারণায় বিএনপিকে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয়েছে; এ থেকে বের হয়ে দল হিসেবে বিএনপিকে একটি ক্লিন ইমেজ পেতে হলে এবং সরকার হিসেবে টিকে থাকতে হলেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে কর্মীদের বিরত রাখতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ জনগণের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণের ট্রেনিংও দেওয়া দরকার হবে তরুণ কর্মীদের। মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং রাজনৈতিক দলের নিজেদের মধ্যে কোন্দল-সহিংসতা এবং সেই সূত্রে হানাহানি পছন্দ করে না। এ ধরনের চর্চা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। আপাতত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এই প্রত্যাশা সবার।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন।
ডেল্টা টাইমস্/রায়হান আহমেদ তপাদার/আইইউ