
সতের বছর আগে তারেক রহমান যখন দেশ ছাড়েন, আর দুই হাজার পঁচিশ সালের পঁচিশ ডিসেম্বর যখন দেশে ফেরেন, এই দুই সময়ের মানুষ কি এক? অধিকাংশ মানুষের উত্তর সম্ভবত না। দীর্ঘ সময় তিনি অবস্থান করেছেন ইংল্যান্ডে, যা আধুনিক শিল্পসভ্যতার সূতিকাগার। যে দেশে শিল্পবিপ্লবের সূচনা, রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক্করণ এবং ম্যাগনা কার্টার মতো ঐতিহাসিক দলিলের জন্ম। ইতালিতে শুরু হওয়া রেনেসাঁস দ্রুতই সেখানে পৌঁছায়। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ওই দেশ হিসেবে এটি সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইংল্যান্ডে অবস্থানের ফলে তারেক রহমান কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন এক ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেখানে যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং বাকস্বাধীনতার চর্চা রাজনৈতিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের কিছু নির্দেশনাও লক্ষণীয়। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিহিংসা পরিহারের আহ্বান তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দেয়। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিও একই ধারার অংশ। বাংলাদেশের সমাজে যখন জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দর্শনচর্চায় খরা চলছে, তখন ফরাসি বিপ্লবের পূর্বক্ষণে জনগণের প্রস্তুতির পর্বটি খেয়াল করা জরুরি। ভলতেয়ার, রুশোসহ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে কালের অগ্রবর্তী চিন্তাবিদ ও লেখকদের একটি দল ব্যাপকভাবে লেখালিখি শুরু করেন।তাঁদের রচনার বিষয় ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, মহাবিশ্ব, মানুষ ও ঈশ্বর-সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তা। এই দর্শনে মানবিক যুক্তির ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও প্রচলিত রাজনৈতিক অনুশীলনের সমালোচনাও ছিল স্পষ্ট।
ফ্রান্সের জনগণ তাঁদের এই দর্শন ব্যাপকভাবে পাঠ করে, গ্রহণ করে এবং গভীর পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয়। ইতিহাস সবাইকে সমান সুযোগ দেয় না। কাউকে কাউকে দেয়; সুযোগ দেয় রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার। কেউ সেটা ধারণ করতে পারেন। কেউ বুঝে ওঠার আগেই জলাঞ্জলি দেন সব সম্ভাবনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার মতো না হলেও, প্রায় কাছাকাছিই এক ধরনের অবস্থায় আছি আমরা। এমন নয় যে এই পঞ্চান্ন বছরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রিক সংকট আমাদের ওপর সওয়ার হয়নি; হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর বৈশিষ্ট্য বা প্রবণতা এই সময়ের তুলনায় একদমই ভিন্ন। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি মিলিয়ে বাংলাদেশ একটা জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গের ওপর বসে আছে। এই সংকট তৈরিই হতো না, যদি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বকীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা যেত। বহু বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, নারী, অসাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভিন্নমত কোণঠাসা হয়ে পড়ল, অনেক ক্ষেত্রেই দক্ষিণপন্থা নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিল। নির্বাচনকে ঠেকিয়ে দেওয়ারও কৌশল নেওয়া হলো নানা ইস্যুর ধুয়া তুলে। ফলে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা যথাযথভাবে প্রস্ফুটিত হতে পারল না। একদিকে বিপুল সম্ভাবনা, আরেক দিকে নানামাত্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। জনগণ বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করল। যে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ ঢুকে যাচ্ছিল, সেখানে বিএনপির শক্ত প্রচারণা ও অবস্থান জনগণের সিংহভাগ অংশকে আশ্বস্ত করতে পেরেছিল যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরেই চলবে। মনে পড়ে, জুলাই আন্দোলনের সময় রব উঠেছিল, বিকল্প কে? ছাত্র-জনতা বলেছিল, তুমি ও আমি। সত্যিই গত ১৮ মাস সেই মানুষগুলো ফ্যালফ্যাল করে দেখেছে মববাজি, জ্বালাও পোড়াও, ভাঙচুর, নারীর প্রতি অসম্মান, অনলাইনে বট আক্রমণ আর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার তাণ্ডবলীলা।
আন্দোলনে রাজপথে নামা বহু মানুষকে শুনতে হয়েছে, এখন কেমন লাগে? গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্ব সেই ভরসার জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেলেন। মানুষ আরও বেশি বিপর্যস্ত বোধ করতে শুরু করলেন। সেই মানুষ, যাঁর চেতনায় বাংলাদেশের জন্মঋণ শোধের অভিপ্রায়, সেই মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাঁর রায়ে জানিয়ে দিলেন, তাঁর কাছে সব সময়ই বিকল্প থাকে। বিকল্পের ভয় তাঁকে দেখানোর দিন আসলে শেষ। দল যেটাই হোক, তাদের অতীত শাসনামল যেমনই হোক, মানুষ কিন্তু সেসব বিবেচনায় নেয়নি। তার বিবেচনায় ছিল একদম ঘটমান বর্তমান আর অতীত বলতে একদম গোড়ায় দেশের জন্মলগ্নের রক্তাক্ত ইতিহাস। সেখানে পক্ষ একটাই-মুক্তিযুদ্ধ। পন্থা একটাই-মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে এই ভোট যেন পরিণত হলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির গণজোয়ারে। বিএনপি যতটা জিতেছে, তার চেয়েও বেশি প্রগতিপন্থী জনগণ তাকে জিতিয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে এই অর্জন নিঃসন্দেহে গৌরবের। এখন রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি ঠিক করতে হবে, সংস্কার করতে হবে, বিচার করতে হবে, অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে হবে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থায় হাত দিতে হবে, উন্নয়ন করতে হবে, নারীর জন্য সুরক্ষিত সমাজ নিশ্চিত করতে হবে, আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে ঠিকঠাক চলতে দিতে হবে, ধর্মীয় ও জাতিগত প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য অনুকূল পরিবেশ রাখতে হবে, বিরোধীদের মতকে জায়গা করে দিতে হবে, দেশ-বিদেশের সম্পর্ক ঠিক করতে হবে এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে-মানে তালিকা করে তো শেষ করা যাবে না।এ রকম অবস্থায়, আমাদের যেমন নেতা প্রয়োজন, তার অধিক প্রয়োজন ত্রাতা। তারেক রহমান কি হয়ে উঠতে পারবেন সেই ত্রাতা? উঠতেই হবে। উপায়ান্তর নেই। কিন্তু কোনটা ছেড়ে কোনটাকে অগ্রাধিকার দেবেন তিনি? একটি দেশের সবকিছুই ঠিক হওয়া সম্ভব, যদি রাজনীতি ঠিক হয়। আর রাজনীতি ঠিক করার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র বা সরকার নয়; মূলত রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার সংকট। সরকার আসবে, সরকার যাবে। দলকে কিন্তু টিকিয়ে রাখতে হবে। নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে। মুখস্থ স্লোগান আর জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ দলীয় নেতা থেকে ছাত্রনেতা যিনিই করুন, জনগণ কিন্তু সেটা মানবে না।
আমাদের রাজনৈতিক দলের এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। তা না হলে যতই আজকে ক্ষমতা থাকুক, পাঁচ বছর পর কিন্তু ঠিকই জনগণ গণেশ উল্টে দেবে। যেকোনো ক্ষমতাসীন দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরবর্তী নির্বাচন। জনগণ এমনিতেই নানা কারণে বীতশ্রদ্ধ থাকে। তার ওপর যদি দলীয় নেতা-কর্মীরা রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে না পারেন, তাহলে দল হিসেবে বিএনপি যেমন বিপদে পড়বে, তেমনই বাংলাদেশও বিপদে পড়বে। তারেক রহমান দেশে ফিরলেন দীর্ঘ ১৭ বছর পর। নির্বাচনের আগে গত দেড় মাসে তিনি ৬৪টি জনসভা করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। জনগণের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ক্ষমতার স্বাভাবিক নিয়মেই জনগণের সঙ্গে তাঁর একধরনের দূরত্ব তৈরি হবে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাঁকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক প্রকোষ্ঠে ঢুকিয়ে ফেলবে। কিন্তু জনগণের মাঝে তারেক রহমানের থাকা দরকার। আরও বেশি বেশি দেশের আনাচকানাচে ঘুরতে পারলে একদিকে দল গোছানোর কাজ হতো, আরেক দিকে জনগণের সঙ্গে সরাসরি মেশার সুযোগ পেতেন তিনি।তারেক রহমানের কাছে জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের আজকের সংকট এত জটিল যে সর্বজনীন নেতা, তথা ত্রাতা হওয়ার জন্য আপাতত একজনই আছেন। অন্যদিকে বিএনপির অনেক বর্ষীয়ান নেতারই হয়তো এবারই শেষবার। তাঁদেরই কেউ হয়তো রাষ্ট্রপতি হবেন । আবার, প্রায় সবাই হয়েছেন পূর্ণমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।সবাই যদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে দলের এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চার শূন্যতা পূরণ হবে কী করে? দুটি দায়িত্ব বয়সের কারণেই তাঁদের পক্ষে পালন করা কি কঠিন হবে না?নিঃসন্দেহে তারেক রহমান এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মোস্ট ভ্যালুয়েবল নেতা তথা নাগরিক। শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতি তথা উদারনৈতিক প্রগতিপন্থী রাজনৈতিক দল বিকশিত করার জন্য তাঁর দিকেই তাই আমাদের চেয়ে থাকতে হবে।
তারেক রহমানের সামনে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ এসেছে। সেটা কি তিনি সরকারপ্রধান হিসেবে হবেন, নাকি দলীয় প্রধান হিসেবে হবেন, নাকি সব ভূমিকা একত্র করে হবেন, সেটাই দেখার বিষয়। যেটাই ঘটুক আর যে ভূমিকাতেই তিনি থাকুন না কেন, পরিকল্পনার ভরকেন্দ্র তাঁর দিকেই ঝুঁকে থাকবে। ফরাসি বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় বিভিন্ন দেশে মানুষ স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে।তবে এই বিপ্লবগুলোর সঙ্গে রুশ বিপ্লবের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অন্যান্য বিপ্লব মানুষের মধ্যে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা যায়নি। রুশ বিপ্লব এই জায়গায় ভিন্নতা সৃষ্টি করে। শ্রমিক ও নারীর মুক্তি ছাড়া প্রকৃত মানবমুক্তি সম্ভব নয়।এই মুক্তি সাম্যবাদী আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব বলে ধরা হয়। কারণ, সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে শ্রমজীবী মানুষ। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে এর উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বর্তমান সময়ে আধুনিক সমাজের একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন হার্ভি ম্যান্সফিল্ড তাঁর দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব র্যাশনাল কন্ট্রোল গ্রন্থে। তিনি বলেন, পূর্বধারণা, কুসংস্কার ও পুরোনো রীতিনীতির পরিবর্তে যুক্তির ভিত্তিতে জীবন পরিচালনাই আধুনিক সমাজের লক্ষণ। কুসংস্কার ও পুরোনো ধারণা মানুষকে সীমাবদ্ধ করে, আর যুক্তি মানুষকে বিচক্ষণ ও আত্মনিয়ন্ত্রিত করে তোলে। সমাজের অন্তর্নিহিত প্রবণতা মানুষকে পুরোনো রীতির দিকে টানে। কিন্তু আধুনিকতার দিকে অগ্রসর হতে হলে যুক্তিনির্ভর জীবনযাপন অপরিহার্য। আমরা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ উন্নত দেশে যেতে চাই, আবার অনেকে স্বপ্ন দেখি আমাদের দেশও একদিন উন্নত হবে। কিন্তু একটি দেশ উন্নত হতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। এই পথচলায় প্রয়োজন দুটি প্রস্তুতি-অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ। শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নতি মানে মননের উন্নয়ন। এই মনন গঠনের বৃহৎ কর্মযজ্ঞ যদি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আয়োজন করতে পারে, তবে আমাদের উচিত তাতে অংশ নেওয়া এবং সহযোগিতা করা।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই