
চলতি মাসের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের মধ্যকার যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখন কেবলই একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম জটিল ও গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে চলেছে। সন্দেহ নেই, এই যুদ্ধটা ইরানের উপর একরকম চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ইরানের ‘মিনাবের শাজারেহ তাইয়েবেহ’ বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি মার্কিনী টমাহক ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়, যাতে ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৬০ জনই নিষ্পাপ শিশু। যুদ্ধের প্রথম দিনই নিহত হয়েছেন ইরানের সুপ্রিম কমান্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব।
এমনকি যুদ্ধের চিরায়ত নীতি-নৈতিকতাও রীতিমতো ভূলুণ্ঠিত করেছেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু নেতৃত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও দেখা গিয়েছে নাৎসি সাবমেরিন কোনো শত্রু জাহাজ ডুবিয়ে দেয়ার পর, তারা ভেসে উঠে বিপন্ন শত্রু সেনাদের উদ্ধার করত; কারণ, নাবিকরা বিশ্বাস করত সমুদ্রের চেয়ে বড় কোনো শত্রু নেই। অথচ এই যুদ্ধে নিয়োজিত না থাকা অবস্থায়, এবং, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে ভারতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফেরার পথে ইরানি নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘দেনা’-কে ডুবিয়ে দিয়ে ডুবন্ত নাবিকদের অসহায় অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যায় মার্কিন নিউক্লিয়ার সাবমেরিন। যুদ্ধনীতির সমস্ত চিরাচরিত নিয়মই এবার ভেঙে দিয়েছে মার্কিন ও তার মিত্রবাহিনী। অসমর্থিত সূত্রে জানা যাচ্ছে, তেহরানে অবস্থিত উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসেও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষান্তে এসে এই সংঘাতের তীব্রতা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা ইরানে বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র হামলা চালাচ্ছে। রেড ক্রিসেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে ইরানে হাসপাতাল, স্কুল, বাসাবাড়িসহ প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের গণমাধ্যমের তথ্যমতে, একই সময়ে ২০৬ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ দেশটিতে নিহত হয়েছেন ১,৩০০ জনেরও বেশি বেসামরিক মানুষ। শুধু ইরান নয়, লেবাননের বৈরুত, হাবুশ ও আল-সাওয়ানাসহ বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫৭০ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং দেড় হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। এই মানবিক বিপর্যয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে, ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আগ্রাসী নীতির বিপরীতে তেহরানের কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা এবং ‘প্রতিরোধের সংস্কৃতি’ যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তা প্রায় অনিবার্যই ছিল। গোটা বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ট্রাম্প যেভাবে আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করছেন, তা বিশ্বশক্তির চিরচেনা মেরুকরণকে চূড়ান্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ধারণা করা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভয়াবহ ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে। ইরান ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একাধিকবার মিসাইল ও ড্রোন হামলা করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে, তারা উপসাগরে ‘E-7A Wedgetail’ এবং ক্রু মোতায়েন করবে, এবং, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে। বোয়িং ৭৩৭-৭০০ বিমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রযুক্তিতে আকাশসীমা উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হলেও, এটি মূলত ধ্বংস হওয়া মার্কিন ঘাঁটিগুলোর রাডার ও ইন্টেলিজেন্সের বিকল্প হিসেবে একটি ‘উড়ন্ত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার’ হিসেবে কাজ করবে। এই একই প্রযুক্তি ইতিপূর্বে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ দাবি করা হয়েছে, কুয়েতে একজন বাংলাদেশি উট রাখালের রেকর্ড করা ভিডিওতে মরুভূমিতে একটি আমেরিকান ‘HIMARS ATACMS M57’ লঞ্চ পড পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যদি এটি সত্য হয়ে থাকে, বলার অপেক্ষা রাখে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ।
হরমুজ প্রণালি ঘিরেও উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও শেয়ারবাজারে তীব্র অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও ইরান প্রণালিতে মাইন স্থাপনের কার্যক্রম চালাচ্ছে, যার বিপরীতে সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ১৬টি ইরানি নৌযান ধ্বংসের দাবি করেছে। ইরানও ৩ টি ইসরায়েলি জাহাজ পুড়িয়ে দেয়ার দাবি করেছে। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, হরমুজে মাইন স্থাপন করলে এমন পরিণতি হবে যা কেউ কখনো দেখেনি। অন্যদিকে, ইরানের আইআরজিসি নতুন কৌশল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কেন্দ্র, ব্যাংক এবং গুগল, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়ার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অবস্থাদৃষ্টে এটাই মনে হচ্ছে যে, ইরান যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে পারে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিন্দুমাত্র প্রস্তুতিও ছিলো না।
যুদ্ধ প্রকৃত অর্থে যুদ্ধের মতোই এগিয়ে চলেছে। দিন যতো এগোচ্ছে, একটি বিষয় ততো স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মিত্রপক্ষ ভেবেছিলো দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের সরকার কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা অসম যুদ্ধের কৌশলের কাছে মার্কিন কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। ট্রাম্প বুঝেছেন, সহসাই ইরানে সরকার পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছেনা। তাই ওয়াশিংটন এখন তাদের যুদ্ধলক্ষ্য পরিবর্তন করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের দিকে মনোযোগ সরাতে বাধ্য হয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে তুলছে। এমনকি যুদ্ধের সবচেয়ে বীভৎস রূপ, ‘দাহিয়া নীতি’র প্রয়োগ করতেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পিছপা হবে বলে মনে হচ্ছেনা।
প্রসঙ্গত, ‘দাহিয়া নীতি’ পশ্চিমাদের একটি বিতর্কিত সামরিক কৌশল, যার মূল লক্ষ্য হলো, যখন শাসক গোষ্ঠিকে কোনোভাবেই পরাস্ত করা সম্ভবপর হয়না, তখন বেসামরিক জনগণের ওপর অবিরাম কঠোর হামলা চালিয়ে তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং শাসনব্যবস্থাকে কোণঠাসা করা। লেবানন ও গাজায় এই নীতির ভয়াবহ প্রয়োগ আমরা দেখেছি, যেখানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পরেও লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এখন ইরানজুড়ে এই নীতি প্রয়োগের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের বিশাল এই দেশটিতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের কঠোর হুঙ্কার এবং ইরানের তেল স্থাপনায় ক্রমবর্ধমান হামলা থেকে বোঝা যায়, এই যুদ্ধ এখন ধ্বংসযজ্ঞের এক নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে। তবে এই কৌশল উল্টো বিপত্তি ঘটাতে পারে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরসিজি) পাল্টা কৌশল হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস শিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৭৩ সালের মতো ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো ট্রাম্প প্রশাসনের চরম স্ববিরোধিতা ও অস্থিরতা। একদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে ‘দ্রুত জয়ের’ বাগাড়ম্বর করছেন এবং ভিক্টরি ঘোষণার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন; আবার ঠিক পরক্ষণেই তিনি স্বীকার করছেন যে, এই যুদ্ধ তাঁর পরিকল্পনা মতো এগোচ্ছে না। নির্বাচনের আগে যিনি বলেছিলেন আর কখনোই বিদেশের মাটিতে মার্কিন সন্তানদের যুদ্ধ করতে পাঠাবেন না, সেই তিনিই আজ নিহত সেনাদের বডি ব্যাগ দেখে তাঁদের ‘হিরো’ বলে সম্বোধন করছেন, যা তাঁর আগের বক্তব্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এমনকি যুদ্ধের শুরুতে তিনি বলেছিলেন কুর্দিশদের ব্যবহার করে ইরানকে কাবু করবেন, কিন্তু তুরস্কের চাপের মুখে কয়েকদিন পরেই সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি জানান, কুর্দিশদের আর এই যুদ্ধে দরকার নেই। ইংল্যান্ডের রণতরীর সাহায্যের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি একদিকে অহংকার দেখাচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই রাশিয়ার কাছে ধরণা দিচ্ছেন ইরানকে থামানোর জন্য, যা তাঁর প্রশাসনিক হীনম্মন্যতা ও চরম অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ।
আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, পুতিন নেতৃত্বাধীন রাশিয়া এখনো বিশ্বমঞ্চের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। স্বভাবতই, সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও, এই সংঘাতের মধ্যে রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান-বিরোধী আগ্রাসন অপরিশোধিত তেলের দামকে প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের উপরে ঠেলে দিয়েছে। এটি ইউক্রেন যুদ্ধে জর্জরিত রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ‘আশীর্বাদ’ হয়ে এসেছে। ক্রেমলিনের সমালোচক ভ্লাদিমির মিলোভের মতে, এই যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য ‘জীবনরক্ষাকারী সঞ্জীবনী’। রাশিয়ার জ্বালানি রাজস্ব বাড়ার ফলে তারা যুদ্ধের ব্যয় বহনে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। এমনকি ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছে রুশ তেল বিক্রি অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষভাবে নমনীয়তা প্রদর্শন করতে হচ্ছে, যা বৈশ্বিক কূটনীতিতে রাশিয়ার অবস্থানকে আরও সুবিধাজনক করেছে।
বললে অত্যুক্তি হবেনা, ট্রাম্প বাধ্য হয়েই রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়েছেন, যাতে পুতিনের মাধ্যমে আলোচনার পথ খোলা যায়; যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক চূড়ান্ত ব্যর্থতার প্রতিফলন। কুয়েতে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়াকে অনুরোধ করে তারা যেনো ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য না দেয়। তা থেকেই স্পষ্ট যে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা হলেও কোণঠাসা। ট্রাম্প প্রশাসন এখন বুঝতে শুরু করেছে, কুর্দিশদের ব্যবহার করে ইরানকে কাবু করা অসম্ভব; কারণ তুরস্কের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তা স্বার্থ এই কুর্দিশ এজেন্ডার সরাসরি পরিপন্থী।
অন্যদিকে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত তারা নিজেরা নেবে। বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকা ও ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইলেও সহসাই তা বন্ধ হচ্ছেনা। একটি চলমান আলোচনার মাঝপথে মার্কিন হামলা ইরান সহ গোটা বিশ্বকেই বার্তা দিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কোনো প্রতিশ্রুতিই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো, পশ্চিমা বিশ্বের ভেতরের নজিরবিহীন ফাটল। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় পশ্চিমা মিত্ররা যেভাবে অন্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিল, এবার তার কোনো প্রতিফলন নেই। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চরম অনীহা দেখাচ্ছে। ইরাক যুদ্ধের মিথ্যা তথ্যের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং ইউক্রেন সংকটের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দিকে ঝুঁকছে। তারা উপলব্ধি করতে পারছে, মার্কিন নীতির অন্ধ অনুকরণ তাদের নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য রীতিমতো জীবনযাত্রার সংকটে পরিণত হয়েছে। খোদ আমেরিকায় তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নভেম্বরের মিড-টার্ম নির্বাচন ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের জন্য এক বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রকাশ্যে যা-ই বলুক না কেন, ভেতরে ভেতরে এই সংকট থেকে বের হওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ, তেল আবিবের কেন্দ্রে ইরানের মিসাইল আঘাত এবং খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর পুত্রের মনোনীত হওয়া; সবই ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান এক চুলও নমনীয় হতে রাজি নয়। ইত্যবসরে ইরান জানিয়ে দিয়েছে, ‘যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ’ ও ‘পরবর্তীতে আর হামলা হবেনা, এমন নিশ্চয়তা’ না পেলে যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হবেনা তারা।
জানা যাচ্ছে, ইসরায়েলকে রক্ষার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ‘থাড’ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রশাসন যুদ্ধের উন্মাদনায় বিভিন্ন দেশের পুরাতন শত্রুতাকেও উসকে দিচ্ছে। অথচ খোদ ইসরায়েলেও অনেক মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারা মাঠ পর্যায়ে নেমে আন্দোলন করতে পারেন এমন আশঙ্কায় ইসরায়েল জুড়ে সকল ধরনের আন্দোলন সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইসরায়েলি সরকার যুদ্ধের ভয়াবহতা আড়াল করতে কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে, কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে তেল আবিবের কেন্দ্রে আঘাত এবং তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষয়ক্ষতির খবর আর গোপন থাকছে না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা স্মরণকালের সবচেয়ে তলানীতে! ইতোমধ্যে দেড়শর বেশি মার্কিন সৈন্য ঘায়েল হয়েছেন, ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ ইতোমধ্যে তাদের হয়ে গিয়েছে! ট্রাম্প বিরোধীরা দিনকে দিন প্রশ্ন তুলছেন যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে। তাই ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ফেরাতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও ৯/১১ স্টাইলে হামলা হয় যদি (মোসাদ বা সিআইএ কর্তৃক সাজানো), তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে বলে মনে হয়না!
এই যুদ্ধ জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তা অভূতপূর্ব। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশসহ অনেক উদীয়মান অর্থনীতি এখন সংকটের মুখে পড়েছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের দাম ও এলসি সংকট চরমে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত আমাদের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী কর্মীর নিরাপত্তা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বলতে দ্বিধা নেই, হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর বিনিময়ে ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিনিদের সাথে যে বিভিন্ন চুক্তি করেছে, তা দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ‘এই যুদ্ধ আমাদের অর্থনীতিকে মূলত তিনটি মাধ্যমে আঘাত করবে- জ্বালানি, ডলার এবং বাণিজ্য’। গত ১২ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধের প্রভাবে ইতোমধ্যে দেশের অয়েল পাম্পগুলোতে তেলের অভাবে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। পরিহাসের বিষয়, পাকিস্তানের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশও নিজস্ব রণতরী দিয়ে তেলের জাহাজ পাহারা দিয়ে নিজ ক্ষেত্রে ঢুকিয়ে নিলো, অথচ, বাংলাদেশকে ডিজেলের জন্য তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে পাশের দেশ ভারতের কাছে।
আমাদের উপলব্ধি করা জরুরি, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, নিজ ভৌগোলিক সীমানার বাইরে ‘শক্তিশালী’ ও ‘আক্রমণাত্মক’ দেশগুলোর রণকৌশল এবং তাদের ‘অস্থিরতার’ প্রভাব সরাসরি আমাদের ওপর পড়ে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মোহনায় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখন পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে। আমাদের সীমান্তের কাছেই বড় শক্তিশালী দেশগুলোর উপস্থিতি রয়েছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন-রাশিয়া-চীন-ভারতের চতুর্মুখী প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে বাংলাদেশ এক ধরণের ‘সর্বমুখী সংকটের’ সামনে। মিয়ানমারের অস্থিরতা, নতুন আরাকান রাষ্ট্রের অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা, রোহিঙ্গা সঙ্কট, ভারতে ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদের বিষফোঁড়া ও এন্টি-বাংলাদেশী সেন্টিমেন্ট, এবং, এই অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রভাব আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
ধর্মীয়-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’ ও ‘ইসরায়েলি আগ্রাসন বিরোধী’ একটি শক্তিশালী জনমত দেশের মানুষের মধ্যে বিরাজমান। ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়া ধ্বংস করা এবং দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও জেরুজালেম দখলের ইতিহাস বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে মার্কিন ও ইসরায়েলি শক্তির বিরুদ্ধে একাট্টা করেছে। তবে এদেশীয় একদল বক্তা ও আলেম শিয়াপন্থী ইরানকে মুসলমান মনে না করে মার্কিন জোটকে সমর্থন দিচ্ছে, যা জনআবেগের পরিপন্থী। এই গভীর জনআবেগ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাকে উপেক্ষা করে কোনো সরকারের পক্ষেই প্রকাশ্য মার্কিনপন্থী অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
বলা বাহুল্য, এই ভূ-রাজনৈতিক ঝড়ে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকলে চলবে না, বরং অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতে হবে। আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সরবরাহ চুক্তির দিকে নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু রুটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাণিজ্যিক করিডোর ও অংশীদার খুঁজে বের করা এখন আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি, ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ -এই নীতির কঠোর অনুশীলন এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার সক্ষমতা বাড়িয়ে সাইবার নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।
অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ বিরোধী আওয়াজ দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধে জড়িয়েছেন; বিষয়টি মোটেই কাকতালীয় নয়। ‘এপস্টাইন ফাইলস’-এর মতো বিশ্ব কাঁপানো কেলেঙ্কারি থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি সরাতেই হয়তো এই যুদ্ধকে কৌশলগতভাবে ত্বরান্বিত করা হয়েছে। রাজনীতি ও নিরাপত্তার এই জটিল সমীকরণের সাথে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
তবে এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার দেশ ইরানকে চিনতে হয়তো ভুল করেছে। তেহরানে লাখ লাখ মানুষের সরকারপন্থী সমাবেশ এবং সভাস্থলে বোমাবর্ষণের মধ্যেও তাদের অনড় অবস্থান প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার পরিচালনা নিয়ে সাধারণ ইরানিদের মাঝে মতভেদ থাকলেও, মার্কিন ও ইহুদি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ।
যুদ্ধের ময়দানে মার্কিন সেনাদের মৃত্যু, এবং, বডি ব্যাগগুলো যখন আমেরিকার মাটিতে ফিরছে, তখন ট্রাম্পের আড়ম্বরপূর্ণ ভাষণ কেবল তাঁর রাজনৈতিক নাটকের বহিঃপ্রকাশ। এই হতাশাগ্রস্ত নেতৃত্ব কেবল ইরান বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকান্ড এই বক্তব্যের পক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
সর্বোপরি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ নতুন বিশ্বব্যবস্থার একটি অশনি সংকেত। এই অস্থিতিশীল পরিবেশে বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করছে সার্বিক খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা, দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর। দূরবর্তী এই যুদ্ধ আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় এখন থেকেই আমাদের নমনীয় কিন্তু অবিচল কৌশলে এগোতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বিশ্বের এই নতুন ও অনিশ্চিত বাস্তবতায় টিকে থাকা এবং এগিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো ধৈর্য, বিচক্ষণ কূটনীতি এবং জাতীয় সক্ষমতা। একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল বাংলাদেশই এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের ঢেউয়ে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
বিশ্বশক্তিগুলোর এই ক্ষমতার লড়াই আমাদের শেখাচ্ছে, নিরাপত্তা কেবল সীমানা পাহারা দেওয়ার বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রস্তুতিতেও আমাদের সমানভাবে সজাগ থাকতে হবে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, ইরান লড়ছে পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের প্রতীক হয়ে, আর এই লড়াইয়ে সাম্রাজ্যবাদের পতন সময়ের দাবি মাত্র।
লেখক:
ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল
পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন গবেষক।
মনিরা রওনক বুবলি
কন্ঠশিল্পী ও সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই