প্রবাসে ঈদের আনন্দ ও বাস্তবতা

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

প্রবাসীদের ঈদ মানে মনে শত কষ্ট নিয়েও হ্যাঁ, আমি ভালো আছি বলা। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা সত্যিই

2026-03-24T10:18:48+00:00
2026-03-24T10:18:48+00:00

প্রবাসে ঈদের আনন্দ ও বাস্তবতা
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৮ এএম   (ভিজিট : ৩০)
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

প্রবাসীদের ঈদ মানে মনে শত কষ্ট নিয়েও হ্যাঁ, আমি ভালো আছি বলা। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা সত্যিই অন্য রকম আনন্দের। কিন্তু সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন প্রবাসীরা। দেশে ঈদ উদযাপন করা আর প্রবাসে উদযাপনের পার্থক্য অনেক। কিন্তু পরিবারের হাল ধরতে এমন পরিস্থিতিকে মেনে নেন প্রবাসীরা। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ-এ কথা সবাই মানলেও প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। সচ্ছল হওয়ার তাগিদে প্রবাসে পাড়ি জমান তারা। এ কারণে জীবনের অনেক স্বাদ-আহ্লাদ ত্যাগ করেন প্রবাসীরা। আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ ভেসে ওঠার পরপরই চারদিকে শোনা যায় চিরচেনা সেই গান ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ...’। সৌদি আরবে শাওয়ালের চাঁদ দেখার পর ঈদ উদযাপিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইউরোপ, আমেরিকাসহ পশ্চিমা প্রায় সব দেশেই উদযাপিত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যক দেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয় কয়েক দিন আগে থেকেই। লন্ডনসহ ব্রিটেনজুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপন হয়েছে। সিয়াম সাধনার মাস রমজান ব্যক্তিজীবনকে সুন্দর, পরিশুদ্ধ ও সংযমী করে। মুমিন মুসলমানরা মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর তাদের জন্য অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। আর ঈদুল ফিতরের উৎসবে সমাজের সব মতভেদ ও সীমানা অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মহামিলন ঘটায় এবং সৃষ্টি করে পরস্পরের প্রতি আন্তরিক মমতাবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ। মাহে রমজান আসতে না আসতেই খুব দ্রুত চলে যায়। খুশির র্বাতা নিয়ে উদিত হয় ঈদের চাঁদ। 

ঈদের চাঁদ উঠলেই হঠাৎ করে প্রবাসীদের চোখের পাতা ভিজে ওঠে। ঈদে প্রবাসীরা মা-বাবার পা ধরে 'কদমবুচি’ করতে পারেন না। মা-বাবার কবর জিয়ারতও করতে পারেন না। সন্তানদের আদর করতে পারেন না। সন্তানদের নানা রকম বায়না ধরার হাসি-কান্না উপভোগ করতে পারেন না। ঈদের মার্কেটিং নিয়ে গিন্নির মান-অভিমান দেখতে পান না। ছোট বাচ্চাদের ‘ঈদ সালামি’ দিয়ে তাদের ‘তৃপ্তির হাসি’ দেখতে পান না। এই দুঃখ বেশির ভাগ প্রবাসীর। আরবের ঘরে ঘরে আনন্দ। প্রবাসীদের মনে কেবল একটাই যাতনা, এত কষ্টের পরও ছেলেমেয়েদের ঈদের কাপড় কিনেই টাকা শেষ। তিন ঈদ চলে গেলেও মায়ের জন্য কেনা হয়নি কিছুই। ঠিক এমন সময় দেশ থেকে ফোন আসে। ফোনে ওপার থেকে মা জিজ্ঞেস করেন, বাজান কী কর? চোখ মুছতে মুছতে আবেগ সামলে রফিক মিয়া বলেন—মা, সব বন্ধুবান্ধব মিলে সেমাই খাই। এটাই হলো মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালিদের ঈদ। ব্যতিক্রম যে নেই তাও নয়। যারা একটু পুরনো, বাড়িতে টাকার চাহিদা যাদের একটু কম তারা অনেকে ঈদে বেশ মজাও করেন। রান্না করেন সেমাই, পোলাও, উটের গোশত। গায়ে জড়ান নতুন জামা। আরবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজও আদায় করে থাকেন। তবে মিসরে বাংলাদেশিদের অবস্থা কিছুটা ব্যতিক্রম। এখানে সাধারণত দুই শ্রেণির বাংলাদেশি আছেন। ছাত্র এবং গার্মেন্টস কর্মী। ছাত্রদের হাতে টাকা-পয়সা কম থাকলেও তারা মোটামুটিভাবে ভালোই ঈদ উদযাপন করে থাকেন। যারা হোস্টেলে থাকেন তারা বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। খাওয়া-দাওয়া সব শেয়ার করেন। নতুন জামাকাপড় পরেন। আর যারা বাসা ভাড়া করে থাকেন তারা অনেকে আগের রাতেই কিছু রান্না করে রাখেন। 

ভোরে নামাজ আদায় করে এসে কিছু খেয়ে ঘুম দেন। দুপুরে উঠে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে আড্ডা দেন। সন্ধ্যায় ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারপর রাতভর আড্ডা অথবা নীল নদের পারে ঘুরতে যান। অপরদিকে গার্মেন্ট কর্মীরা ঈদে তিন-চার দিন ছুটি পান। তারা সাধারণত এক সঙ্গে অনেকে থাকেন। কাজেই তাদের ঈদ আনন্দটা একটু বেশিই। খাবার আয়োজনেও তারা বেশ মনোযোগী। পাঁচ-সাতজন মিলে রান্না করেন। দুপুরে বিভিন্ন জাগায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যায় অনেক সময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। একসঙ্গে নাচ-গান ও মজা করেন। রাতে শুরু হয় দেশে ফোন করার প্রতিযোগিতা। কারণ পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ। সারাদিন যতই উৎফুল্ল থাকুক রাতে দেশে কথা বলতে গিয়ে সবাই আবেগী হয়ে ওঠেন। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মেলাতে না পেরে সবাই প্রায় একই মুখস্থ উত্তর দেন, ‘অনেক কিছু খাইছি অনেক মজা করছি আমি ভালো আছি আমাকে নিয়ে চিন্তা কর না। এদিন একজন অন্যজনের দাওয়াতী মেহমান হিসেবে বাসায় আসেন। ঘরোয়া পরিবেশে কতই না মজা হয়। যা এক সময়ে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি হয়ে রয়। এই আনন্দময় সময় গল্প-গুজব প্রবাসে আধুনিকায়নের যুগে সব থাকা সত্ত্বেও পাওয়া যায় না। তাই চিরস্মরণীয় এই দিনে বিলেত থেকে মনে পড়ে সবাইকে। প্রবাসে সবই আছে। নেই লাল সবুজের সুজলাসুফলা শস্য-শ্যামল বাংলাদেশ। ঈদ আছে। নেই ঈদের আনন্দ। প্রতিবেশীও আছে। নেই মনের মতো প্রতিবেশী। এই খণ্ড খণ্ড হৃদয়ের চাওয়াগুলো প্রবাসের এত চাকচিক্যের মাঝে মন ভরে না। ফিরে যেতে মন চায় মাটির টানে স্বদেশের আঙিনায়। মানুষ যেখানে যায় সেখানে দুটো শক্তি যায়। এক-বিশ্বাস, দুই-সংস্কৃতি। বিদেশে এই সময়ে যে লাখ লাখ বাঙালি তাদের স্থায়ী নিবাস করে নিয়েছেন, তারাও মূলত এই শক্তিতে বলীয়ান। ধর্ম বিশ্বাসের একটি স্তর। 

অভিবাসীদের আনন্দের একটি অন্যতম দিন হলো-ঈদ। ঈদ এলেই অভিবাসী বাঙালির মনের ক্যানভাসে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো স্বদেশের মুখ। কেমন আছেন স্বজন? কেমন আছে জন্মমাটি? প্রবাসে ঈদের আনন্দ মানেই হচ্ছে এক ধরনের তীব্র শূন্যতা। কথাটি সব প্রবাসীই স্বীকার করবেন একবাক্যে। তার কারণ হচ্ছে, ঈদের দিনটি এলেই এক ধরনের নস্টালজিয়া মনটাকে ভারি করে তোলে। ফেলে আসা সেই শহর কিংবা গ্রাম, সেই আড্ডা, সেই মধুর স্মৃতি, মা-মাতৃভূমির টান বুকের পাঁজরে দোল খেয়ে যায়। আহা! সোনার আলোয় ভরা সেই দিনগুলো...। প্রবাসে ঈদের অভিজ্ঞতা আমার তিন দশকের বেশি সময়ের। বিদেশের বিভিন্ন দেশে ঈদ করতে গিয়ে যে সত্যটি খুব একান্তভাবে প্রত্যক্ষ করেছি তা হচ্ছে, প্রবাসে একজন বাঙালিই অপর বাঙালির ঘনিষ্ঠ স্বজন। তা পরিচিত হোক অথবা অপরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ঈদের আনন্দই আলাদা। ইউরোপ- আমেরিকায় সেই আবহের ভিন্নতা স্পষ্ট। তার কারণ হচ্ছে, এখানে ঈদ একটি সম্প্রদায়ের উৎসব, যে সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা পুরো রাষ্ট্রের জনসংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র। ব্রিটেনে ক্রমবর্ধমান বাঙালি অভিবাসনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ধর্মীয় কালচারও। বাংলাদেশী স্টাইলে এখানে এখন তৈরি হয় ইফতারি। ভারতীয়-বাংলাদেশি বিপণিবিতানগুলো ঈদ উপলক্ষে সজ্জিত হয় আলোকসজ্জায়। রীতিমতো জমজমাট ঈদের বাজার। ব্রিটেনের স্কুল-কলেজগুলোতে এখন হাজার হাজার বাঙালি অভিবাসী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। দুই ঈদে সরকারি ছুটি মঞ্জুর করা হয়, ব্রিটেন ও নিউইয়র্কে। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এ কথা সত্য হলেও সবার জন্য সমান সত্য নয়। কারণ দেশে আত্মীয়-পরিজন নিয়ে মহা-আনন্দে ঈদ উদযাপন করলেও প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না।

আর তাই ঈদে তাদের আনন্দটা অতটা গাঢ় রঙ ধারণ করে না। প্রবাসে অনেকেই আছেন যাদের জন্য ঈদের দিনটি অত্যন্ত কষ্টের। এই কষ্টকে বুকে নিয়েই ব্রিটিশ বাংলাদেশি প্রবাসীরা ঈদ উদযাপন করে থাকেন। প্রবাসীদের ঈদ উদযাপনের খোঁজখবর নিতে গিয়ে তেমনটাই আঁচ করা গেল।প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন,বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের মতো এখানেও ঈদকে নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না। কিন্তু প্রিয়জনদের হাজার মাইল দূরে রেখে ঈদ আনন্দ পাথরচাপা কষ্টে পরিণত হয়। আত্মীয়-স্বজন রেখে দূর দেশে ঈদ করাটা সত্যিই বেদনার। ঈদের মতো বিশেষ দিনেও অনেককে কাজ করতে হয়, ছুটি পাওয়া যায় না, কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত থাকে। এসব কষ্ট তাদের ঈদের আনন্দকে কিছুটা ম্লান করে দেয়। তারপরও প্রবাসীরা আশাবাদী। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তারা পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। দূরে থেকেও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, সন্তানদের হাসি দেখেন, প্রিয়জনের কণ্ঠ শুনে মন ভরে তোলেন। এই ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোই তাদের জীবনে বড় শক্তি যোগায়। প্রবাস জীবনের ঈদ তাই এক অনন্য অনুভূতির মিশ্রণ আনন্দ ও বেদনা, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতা, ত্যাগ ও সাফল্যের সমন্বয়। দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং পরিবারের জন্য দায়বদ্ধতা তাদের প্রতিটি কষ্টকে সহনীয় করে তোলে। তারা জানেন, তাদের এই ত্যাগই একদিন স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে, পরিবারে আনবে স্বচ্ছলতা, আর দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  সর্বশেষ সংবাদ  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]